১৯৯১ সালে অস্ট্রেলিয়াতে প্রথম জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট প্রণয়ন করা হয়। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই উদ্যোগ শুরু হয়। বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন নারী সংগঠন, উন্নয়ন সহযোগী সংগঠন, জেন্ডার বিষয়ক গবেষকম-লী বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে নারীর প্রতি বৈষম্য এবং অসমতা দূর করতে জেন্ডার বাজেট প্রণয়নের দাবি উত্থাপন করে আসছেন। এসব দাবির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশেও ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে বাংলাদেশ সরকার জাতীয় বাজেটের সাথে একটি ‘জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন’ প্রণয়ন শুরু করে। প্রথম বছরে সরকারের ৪টি মন্ত্রণালয়ের এবং দ্বিতীয় বছরে ১০টি মন্ত্রণালয়ের কার্যাবলি নিয়ে এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তৃতীয় বছরে প্রতিবেদনটিতে ২৫টি এবং চতুর্থ বছরে ৪০টি মন্ত্রণালয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরেও জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে ৪০টি মন্ত্রণালয়/বিভাগের বাজেটে নারী উন্নয়ন ও নারীর অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। আশা করা যায়, আগামী অর্থবছরে সরকারের সবক’টি মন্ত্রণালয়কে জেন্ডার বাজেটের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

২০১৪-১৫ অর্থবছরের জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘নারীর প্রতি সহিংসতার অন্যতম কারণ হলো, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পশ্চাৎপদতা এবং জেন্ডার বৈষম্য। এ বৈষম্য সম্পর্কে সরকার সচেতন আছে এবং তা দূর করতে বদ্ধপরিকর।’ এরই লক্ষ্যে এবারের জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে ৪০টি মন্ত্রণালয়-বিভাগকে তিনটি গুচ্ছে ভাগ করা হয়েছে-

  • নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি; এর অধীনে রয়েছে ৭ টি মন্ত্রণালয়।
  • উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শ্রম বাজার ও আয়বর্ধক কাজে নারীর অধিকতর অংশগ্রহণ; এর অধীনে রয়েছে ৯টি মন্ত্রণালয়।
  • সরকারি সেবা প্রাপ্তিতে নারীর সুযোগ বৃদ্ধি; এর অধীনে রয়েছে ২৪টি মন্ত্রণালয়।

সূত্র: জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন ২০১৪-১৫
সূত্র: জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন ২০১৪-১৫

জেন্ডার বাজেট মূলত সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের বাজেটে নারীর হিস্যা, জেন্ডার বৈষম্য চিহ্নিতকরণ এবং দূরীকরণে মন্ত্রণালয়ের গৃহীত কৌশল, উক্ত মন্ত্রণালয়ের নারী বিষয়ক কার্যক্রমের অর্জন এবং বাধাসমূহের একটি লিখিত দলিল মাত্র।

২০১৪-১৫ অর্থবছরের মোট বাজেট ছিল ২, ৫০,৪৯৭ কোটি টাকা এবং নারীর হিস্যা ৬৬,৭৩৯ কোটি টাকা। যা মোট বাজেটের মাত্র ২৬.৬৪ শতাংশ। অথচ জনসংখ্যা অনুপাতে নারী জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধ শতাংশ। আবার বিগত অর্থবছরের (২০১৩-১৪) তুলনায় নারীর হিস্যা কমেছে ১.০ শতাংশ। এছাড়া জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের বাজেটে নারীর হিস্যা গত অর্থবছরের তুলনায় কম।

ক. নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি অনুচ্ছেদ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়:

  • প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে নারীর হিস্যা কমেছে ২.৭২ শতাংশ
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কমেছে ০.৬৮ শতাংশ
  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে কমেছে ৪.৩৮ শতাংশ
  • মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে কমেছে ৬.৭৪ শতাংশ

খ. উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শ্রমবাজার ও আয়বর্ধক কাজে নারীর অধিকতর অংশগ্রহণ অনুচ্ছেদে লক্ষ্যণীয়:

  • সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে কমেছে ০.৬৮ শতাংশ
  • শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে কমেছে ৮.৩৬ শতাংশ
  • দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে কমেছে ২.২০ শতাংশ

গ. সরকারি সেবা প্রাপ্তিতে নারীর সুযোগ বৃদ্ধি অনুচ্ছেদে দেখা যায়:

  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে কমেছে ৮.১৩ শতাংশ,
  • স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কমেছে ১.০৬ শতাংশ এবং
  • সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে কমেছে ১.৫৪ শতাংশ

এছাড়াও গত অর্থবছরের মতো এবারের বাজেটেও নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের জন্য ১০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু এ থোক বরাদ্দের টাকা কোথায়, কিভাবে ব্যয় করা হবে তা বাজেটে স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি।

জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ এর ৯ নং অনুচ্ছেদে নারীকে মানবসম্পদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে টেকসই জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নারীকে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই। আরো বলা হয়েছে, দক্ষ মানব সম্পদ তৈরির জন্য নারীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশিক্ষণ, মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে।

সুত্র: জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন ২০১৪-১৫, লেখকের নিজস্ব হিসাব
সুত্র: জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন ২০১৪-১৫, লেখকের নিজস্ব হিসাব

২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতার ৭০ নং অনুচ্ছেদে মাননীয় অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, “আমরা মানেকরি বর্তমান সময়ে নারী উন্নয়নকে রাষ্ট্র ও সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন থেকে আলাদা করে দেখার কোন সুযোগ নেই। বরং আধুনিক বিশ্বে প্রতিটি উন্নয়ন পরিকল্পনায় নারী অধিকারের বিষয়টি সম্পৃক্ত করা হয়। আমরা প্রতিটি উন্নয়ন পরিকল্পনা ও নীতিমালাকে নারীর প্রতি সংবেদনশীল (Gender Responsive) করার উদ্যোগ নেব। এর ফলে মন্ত্রণালয়গুলো মধ্যমেয়াদি বাজেট সীমার মধ্যেই নারীর কল্যাণে বেশীরভাগ কর্মসুচি বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবে।”

অথচ বাজেটের উন্নয়ন বরাদ্দে নারীর হিস্যা গত অর্থবছরের তুলনায় টাকার অংকে বৃদ্ধি পেলেও শতকরা হারে তা ৭.৬৯% কম। এছাড়া প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ৮৯ কোটি টাকার মধ্যে নারীর প্রাপ্তি মাত্র ৫ শতাংশ এবং এ মন্ত্রণালয়ের ২ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেটে নারীর কোনো হিস্যাই নেই।

উন্নয়ন বাজেটে নারীর হিস্যা (কোটি টাকায়)

বিবরণ ২০১৪-১৫ ২০১৩-১৪
মোট বাজেট ২,৫০,৪৯৭ ২,২২,৪৯১
এডিপি ৮০,৩১৫ ৬৫,৮৭০
এডিপি (নারীর হিস্যা) ৩১,২৯৫ ৩০,৭৩৮
এডিপি (নারীর হিস্যার শতাংশ) ৩৮.৯৭% ৪৬.৬৬%

সূত্র: জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন ২০১৪-১৫; লেখকের নিজস্ব হিসাব

বাংলাদেশ সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দের সারণীচিত্রে দেখা যায়, ২০১০-১১ অর্থবছরে মোট উন্নয়ন প্রকল্পের সংখ্যা ছিল ৯১৬ টি যার মধ্যে জেন্ডার সংবেদনশীল উন্নয়ন কর্মসূচি ছিল মাত্র ২৭২টি (২৯.৬৭ %) এবং কেবল নারী লক্ষ্যভূত উন্নয়ন কর্মসূচি মাত্র ২৬টি (২.৮৪%)। মোট উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থের পরিমাণ ৩৮৫০০ কোটি টাকা যার মাত্র ১.২৮% বরাদ্দ দেয়া হয় কেবল নারী লক্ষ্যভূত উন্নয়ন কর্মসূচিতে। ২০০০-২০১১ এই ১০ বছরে এর সীমা ছিল সর্বোচ্চ ৩.৬% (২০০২/০৩) থেকে সর্বনিম্ন ১.২৮%।

এমনকি দেশের ৬০ শতাংশেরও বেশি জনগোষ্ঠীর (নারী ও শিশু) উন্নয়নের জন্য সৃষ্ট মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের গত ৪ অর্থবছরের বাজেট মোট প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের ১ শতাংশেরও কম।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ ২০১১/১২-২০১৪/১৫ (কোটি টাকায়)

বিবরণ ২০১৪-১৫ ২০১৩-১৪ ২০১২-১৩ ২০১১-১২
মোট বাজেট ২,৫০,৪৯৭ ২,২২,৪৯১ ১,৯১,৭৩৭ ১,৫২,৪৪৮
মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ১,৫৮১ ১,৪৪৯ ১,৩০৬ ১,২৩৭
শতকরা হার ০.৬৩১% ০.৬৫১% ০.৬৮১% ০.৮১১%
সুত্র: জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন ২০১৪-১৫, লেখকের নিজস্ব হিসাব
সুত্র: জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন ২০১৪-১৫, লেখকের নিজস্ব হিসাব

শুধু বাজেট অপ্রতুলতা নয়; জেন্ডার বাজেটে বরাদ্দকৃত টাকা কোন প্রকল্পে কত টাকা কিভাবে খরচ করা হবে তার কোন প্রতিরূপ এই প্রতিবেদনে নেই। প্রকল্পসমূহের তদারকি ও জেন্ডার বাজেট অডিট বিষয়ক কোন আলোচনাও এই প্রতিবেদনে দৃশ্যমান নয়।

প্রতিবেদনে নারীর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্যের কারণ এবং তা দূরীকরণে গৃহীত পদক্ষেপসমূহের সাফল্য এবং বাধাসমূহের কথা উল্লেখ করা হলেও নারীর ‘অমূল্যায়িত সেবামূলক কাজ’ এর অর্থনৈতিক এবং সামাজিক গুরুত্বের কথা এর কোন অংশেই উল্লেখ করা হয়নি। অথচ, জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থার মতে, বাংলাদেশে জেন্ডার বৈষম্যের অন্যতম বড় কারণ হল নারীর গৃহস্থালীর কাজের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি না থাকা। একশনএইড বাংলাদেশ ও বিবিএস-এর পৃথক গবেষণায় দেখা যায় নারীরা প্রতিদিন প্রায় ছয় থেকে সাত ঘণ্টা সময় ব্যয় করে গৃহস্থালীর সেবামূলক কাজে।

এছাড়াও এই বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া অংশগ্রহণমূলক নয়। অর্থাৎ নারীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে জেন্ডার বাজেট প্রণয়ন করা হয় না। ফলত, নারীর সমস্যা এবং তা হতে উত্তরণের পদক্ষেপ গ্রহণে গৃহীত কর্মসূচিতে নারী সার্বিক উন্নয়ন চিত্রায়িত হয় না। তথাপি এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, জাতীয় বাজেটকে জেন্ডার সংবেদনশীল করতে এবং নারী উন্নয়নে প্রণীত জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির সাক্ষ্য বহন করে।

জেন্ডার বাজেটকে সার্বিক নারী উন্নয়নের লক্ষ্যাভিমুখী ও অংশগ্রহণমূলক করার লক্ষ্যে নিন্মক্ত দাবিসমূহের প্রতি সরকারের মনোযোগ প্রত্যাশা করছি:

  • জেন্ডার বাজেটে নারীর হিস্যা শতাংশিক হারে বাড়াতে হবে।
  • শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে নারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে ‘নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১’ -এর আলোকে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে।
  • শুধু বাজেট বরাদ্দ করলেই হবে না, আগামী বাজেটে পরীক্ষামূলকভাবে অন্তত পাঁচটি মন্ত্রণালয়ে জেন্ডার বাজেট মনিটরিংয়ের উদ্যোগ নিতে হবে।
  • জেলা ভিত্তিক জেন্ডার বাজেট প্রণয়ন করতে হবে।
  • ‘জেন্ডার বাজেট’ নারীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রণয়ন করতে হবে।
  • জেন্ডার বাজেটে নারীর অমূল্যায়িত সেবামূলক কাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্বকে প্রাধান্য দিতে হবে।
জেন্ডার বাজেট