স্বাস্থ্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার এবং সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত মানব উন্নয়নের সূচক। স্বাস্থ্যের উন্নয়ন শুধুমাত্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই নয়; মানুষের জীবনের গুণগত মান ও সামাজিক প্রগতির ভিত্তিস্বরূপ। ধনী-গরিব সকলের জন্য মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসেবায় রয়েছেন জনবল সংকট ও এর বিন্যাসে আঞ্চলিক বৈষম্য; এর সাথে রয়েছে অবকাঠামো, আধুনিক যন্ত্রপাতি, জবাবদিহিতা ও ব্যবস্থাপনার সংকট। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি বরাদ্দের ঘাটতি, স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তিতে গ্রাম-শহর, ধনী-দরিদ্র অসম সুযোগ ও বঞ্চনা জনগণের জীবনমান উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

জাতীয় বাজেটে অবহেলিত স্বাস্থ্যখাত

গত কয়েকবছর ধরে জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বরাদ্দ মোট বাজেটের তুলনায় ও জিডিপি’র শতকরা হারে কমছে বা একই রকম রয়েছে।  ২০০৯ অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় মোট বাজেটের ৫.৭%, ২০১৫ অর্থবছরে এটা কমে দাঁড়িয়েছে ৪.৫%। এ সময়কালে স্বাস্থ্যখাতে জিডিপি’র অংশ ০.৮%-এ স্থির রয়েছে (লেখচিত্র ১)।

Sectoral_budget_health_01
Sectoral_budget_health_02

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে জিডিপি’র ৫% বরাদ্দ করা হলে একটি মাঝারি মানের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চালানো সম্ভব। বাংলাদেশের বর্তমান কর-জিডিপি অনুপাতের তুলনায় এটা অবাস্তবায়নযোগ্য মনে হলেও উদ্বেগের বিষয় হলো ৬ষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দ কমছে, যা বরাদ্দের অপ্রতুলতাকে নির্দেশ করছে  (লেখচিত্র ২)।

আন্তর্জাতিক মানদন্ডে বাংলাদেশে মাথাপিছু স্বাস্থ্যব্যয়সর্বনিম্ন

আন্তর্জাতিক মানদন্ডে বাংলাদেশে মাথাপিছু স্বাস্থ্যব্যয় (সরকারি, বেসরকারি এবং ব্যাক্তিগত) সর্বনি¤œ পর্যায়ে রয়েছে , ২৭ ইউএস ডলার, যেখানে ভারতে ৬১ ইউএস ডলার এবং মালয়শিয়যায় ৪১০ ইউএস ডলার (লেখচিত্র ৩)।
Sectoral_budget_health_03Sectoral_budget_health_04

বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্যব্যয়ে সরকারি ব্যয় সর্বনিম্ন এবং ব্যক্তিগত ব্যয় (Out of pocket expenditure) সর্বোচ্চ

লক্ষ্যণীয় বিষয় হল এ দেশগুলোর মধ্যে মোট স্বাস্থ্যব্যয়ে সরকারি ব্যয় বাংলাদেশে সবচেয়ে কম (২৩%), যেখানে ভারতে ৩৩% এবং নেপালে ৪০%। অপরদিকে স্বাস্থ্যখাতে ব্যক্তিগত ব্যয় বাংলাদেশে সর্বোচ্চ (৬৩.৩%) যেখানে ভারতে ৫৭.৩% এবং নেপালে ৪৯.২%।

বাংলদেশে স্বাস্থ্যখাতের মোট ব্যয়ে ব্যক্তিগত ব্যয় অনেক বেশী হওয়া সত্বেও স্বাস্থ্যসেবার বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহের অতিমুনাফার প্রবনতা, রোগীদের অতিরিক্ত চিকিৎসার ব্যয় বাড়ানো প্রবনতা, সরকারি নজরদারির অভাব-এর ফলে স্বাস্থ্যসেবায় জনগণকে স্থায়িত্বশীল অসহায়ত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

স্বাস্থ্যসেবার সরকারি ব্যয়ে অসমতা

কেন্দ্রীভূত বনাম স্থানীয় পর্যায়ে ব্যয়: উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং নিচের দিকের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানসমূহে জনগণ তাৎক্ষনিকভাবে যোগাযোগ করে; কিন্তু সরকারি ব্যয়ের ধরণ ঠিক এর বিপরিত। উপরের দিকের প্রতিষ্ঠানসমূহে ব্যয় বেশী, নীচের দিকে কম  লেখচিত্র ৫)। দ্বিতীয়ত: সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয়ে দরিদ্র জেলাসমূহ এখনো পিছিয়ে আছে। Public Expenditure Review of the Health Sector 2007/08 and 2008/09 অনুযায়ী, যেসব জেলায় ধনীনমানুষের সংখ্যা বেশী, সরকারি ব্যয় সে জলাসমূহে এখনো বেশী; তবে এ হার নিম্নমুখী।
Sectoral_budget_health_05Sectoral_budget_health_06

অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা ও সম্পদের অপচয়

জনবল ঘাটতি, যন্ত্রপাতির অভাব ও বিন্যাসে বেষম্য : বাংলাদেশে সরকারি স্বাস্থ্যখাতে জনবল সংকট ও এর বিন্যাসে বৈষম্য রয়েছে। এর সাথে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানসমূহে পদশূন্য থাকার ফলে ঢাকার বাইরের জেলাসমূহে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তিতে বৈষম্য সৃষ্টি করছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ৩০% চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে।  শূন্যপদের পরিমান জেলাও উপজেলা পর্যায়ে বেশি; অপরদিকে চিকিৎসকের তুলনায় নার্সের পদ অনেক কম। বিশ্বস্বাস্থ্যর সুপারিশ অনুযায়ী একজন ডাক্তারের সাথে চারজন নার্স থাকার কথা, সেখানে বাংলাদেশে নার্সের পদ চিকিৎসকের তুলনায় ১.২। বাংলাদেশ হেলথ ফেসিলিটি সার্ভে ২০১৪ অনুযায়ী জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিাকৎসকের পদ শূন্য রয়েছে সবচেয়ে বেশী (লেখচিত্র ৬)। একইভাবে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীদের সেবা দেয়ার জন্য অত্যাবশ্যকীয় সুবিধা ও যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে (লেখচিত্র ৭)।

অদক্ষতা ও সম্পদের অপচয়: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও যন্ত্রপাতির অভাবে একদিকে উপজেলা হাসপাতাল অপর্যাপ্ত ব্যবহার হচ্ছে, শয্যা খালি থাকছে, অপরদিকে জেলা ও বড় শহরের হাসপাতালে রোগীদের ভীড় লেগেই আছে। সারা দেশ থেকে ঢাকা মেডিকেল ও পিজি হাসপাতালে মানসম্মত চিকিৎসার আশায় রোগীদের শয্যা পেতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সরকারি হিসাবে উপজেলা হাসপাতালে শয্যা পূরণের (ইবফ ঙপপঁঢ়ধহপু) হার ৭৭.২% । যন্ত্রপাতি ও উপকরণ সংকটের সাথে সাথে রয়েছে সরকারি হাসপাতালে অব্যবহৃত যন্ত্রপাতির স্তূপ। বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণে ৪২% মেডিকেল যন্ত্রপাতিই বাক্সবন্দি । যন্ত্রপাতি বাক্সবন্দি থাকার পেছনে যেমন লোকবলের অভাব রয়েছে, তেমনি অনেক যন্ত্রপাতি অপরিকল্পিতভাবে ক্রয় করে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। এর সাথে সাথে রয়েছে স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন পর্যায়ের দূর্ণীতি।
Sectoral_budget_health_07Sectoral_budget_health_08

কেন্দ্রীভূত স্বাস্থ্য বাজেট- জনচাাহিদা ও অধিকার পূরণের সুযোগ নেই

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রণালয়ের আওতায় দেশের বিভিন্ন্ অঞ্চলের জন্য স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানসমূহের আকার, শয্যা সংখ্যা ও সেবা প্রদানের ওপর ভিত্তিকরে বরাদ্দ প্রদান করা হয়। বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে কেন্দ্রীভূত।  বরাদ্দ প্রদানের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের চাহিদা, প্রয়োজন ও রোগের প্রবণতা বিবেচনার প্রাতিষ্ঠানিক কোন সুযোগ নেই। উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নিচের প্রতিষ্ঠানসমূহ উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সাথে সম্পর্কযুক্ত। বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র সরাসরি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাথে সম্পর্কযুক্ত; এ ক্ষেত্রে জেলাভিত্তিক বা জেলার সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের সাথে কোন সম্পর্ক নেই।  স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রণীত নির্দেশিকা অনুযায়ী উপজেলার স্বাস্থ্যবাজেট নির্ধারিত হয়। কোনখাতে কত ব্যয় হবে অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয় তা নির্ধারণ করে। স্থানীয় চাহিদার আলোকে নতুন কোন খাত অন্তর্ভূক্তির কোন সুযোগ এখানে নেই। উপজেলা স্বাস্থ্যবাজেটের কাঠামোয় দেখা যায় যে, কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ৫২%, এরপর রয়েছে ভাতার পরিমান ৩৭% (লেখচিত্র ৮)। সরবরাহ ও সেবাখাতে রয়েছে ১১%; যেখানে খাবার সরবরাহ খরচের প্রধান খাত। যে কারণে যন্ত্রপাতি বা কোন কিছুর অসুবিধা হলে স্থানীয়ভাবে সমাধানের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।

সুপারিশ:

  • স্বাস্থ্যবাজেট বরাদ্দ ও ব্যয়ে সকল অসমতা দূর করতে হবে;
  • স্বাস্থ্যখাতে নিয়োজিত জনবলের সুষম বিন্যাস নিশ্চিত করতে হবে; জেলা ও উপজেলার স্বাস্থকেন্দ্রসমূহের সম্পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা থাকতে হবে;
  • অবিলম্বে স্বাস্থ্যখাতের সকল শূণ্যপদ পূরণ করতে হবে। বাজেটে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা প্রয়োজন;
  • স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সকল অপচয়, দূর্ণীতি দূর করতে হবে;
  • স্বাস্থ্যবাজেট প্রণয়নে জেলা পর্যায়ে সমন্œয় এবং উপজেলা স্বাস্থকেন্দ্রের স্থানীয় চাহিদার আলোকে জনঅংশগ্রহণের ভিত্তিতে বাজেট প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। অর্থমন্ত্রণালয়কে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে;
  • সকলের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য ঘোষিত নীতির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় বরাদ্দ এবং এর মানসম্মত বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে বাস্তবসম্মত পথনকশা ঘোষণা করতে হবে।
জাতীয় বাজেট ও স্বাস্থ্য খাত