প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা নিয়ে অস্পষ্টতা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্ব ব্যাংক এর যৌথ প্রতিবেদন (২০১১) অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা প্রায় ১০০ কোটি, যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫.৭%শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যূরো এর জুন ২০১১ -এ আনুষ্ঠানিকভাবে অবমুক্ত ‘খানা আয় ব্যয় জরিপ ২০১০’ অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ২.৬ শতাংশ মানুষের দৃশ্যমান প্রতিবন্ধিতা রয়েছে। ২০১১ সালের আদমশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী হচ্ছে মোট জনসংখ্যার ১.৪ শতাংশ। অন্যদিকে, সমাজসেবা অধিদপ্তরের ২০১৩ সাল থেকে চলমান প্রতিবন্ধীতা সনাক্তকরণ জরীপ অনুযায়ী, দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ২% এর নিচে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের এই প্রতিবন্ধীতা সনাক্তকরণ জরীপ এখন প্রায় শেষ হওয়ার পথে। প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা নিয়ে অস্পষ্টতা থাকায় যথাযথ উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেট বরাদ্দ ব্যাহত হচ্ছে

উপেক্ষিত প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী – শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নেই

Sectoral_budget_disability_01
মূল বাজেট দলিলে ‘সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ’ খাতের অধীনে ৫টি মন্ত্রণালয়/বিভাগ (সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রাণালয়, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রাণালয়, থাদ্য বিভাগ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ বিভাগ) রয়েছে। প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দসমূহ মূলত এই খাতেই দৃশ্যমান হয়। তাছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয় আলাদাভাবে ‘সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী’ নামে একটি দলিল প্রণয়ন করে, যেখানে ‘সামাজিক নিরাপত্তা ও সামাজিক ক্ষমতায়ন’ উপখাতে বরাদ্দগুলিকে পৃথক পৃথকভাবে দেখানো হয়। ২০০৯ তেকে ২০১৫ পর্যন্ত এসব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশের প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সংখ্যার তুলনায় এ বরাদ্দ অপ্রতুল। তবে লক্ষ্যণীয় যে, ফি বছর সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে বাজেট বরাদ্ধ বৃদ্ধি ও নতুন প্রকল্প গ্রহন করছে। কিন্তু তাদের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ খাতে কোন বাজেট বরাদ্ধ নেই, যেমন “প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩” এবং “নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল ট্রাষ্ট২০১৩” এর বিধি ও জাতীয় কর্ম পরিকল্পনা প্রণয়ণ ও বাস্তবায়নের জন্য কোন বাজেট বরাদ্দ নেই;একীভূত শিক্ষা বাস্তবায়নে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত সংস্কার, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ব্রেইল পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষা সহায়ক উপকরণ বিতরণকার্যক্রমের জন্য কোন বাজেট বরাদ্দ নেই;বাংলা ইশারা ভাষার প্রাতিষ্ঠানিকীকরনের জন্য কোন বাজেট বরাদ্দ নেই। এছাড়াও শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন খাতের আওতাধীন সেবাসমূহকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করার ক্ষেত্রে বরাদ্ধ বা উদ্যোগসমূহ খবই অপ্রতুল।

প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সরকারের ঘোষিত নীতি, অঙ্গীকার ও পরিকল্পনার প্রতিফলন বাজেট বরাদ্দে দেখা যায় না

দেশের প্রতিবন্ধী মানুষের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চলাফেরা, যোগাযোগ সহজ করা এবং তাদের অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারি নীতি ও বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারি রাজনৈতিক দলের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এছাড়াও সরকারের ৫ম ও ৬ষ্ঠ পঞ্চম বার্ষিকী পরিকল্পনায় দেশের প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য যথাযথ উন্নয়ন কর্মসূচী প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য এসব নীতি, প্রতিশ্রুতি ও উন্নয়ন কর্মসূচীর বাস্তবায়ন তেমন একটা অর্থপূর্ণভাবে ভূমিকা রাখতে পেরেছে বলে মনে হয় না। বর্তমান সরকারের বিগত নবম জাতীয় সংসদে “প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩” এবং “নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল ট্রাষ্ট ২০১৩” পাস করা হয়েছে। কিন্তু এই আইন দুটি কার্যকর করতে বিধিমালা ও জাতীয় কর্ম পরিকল্পনা প্রণয়ণ এবং বাস্তবায়নেরজন্য পর্যাপ্ত বাজেট প্রয়োজন।
Sectoral_budget_disability_02
Sectoral_budget_disability_03

নির্বাচনী অঙ্গীকারের বাস্তবায়নের জন্য বাজেট বরাদ্দ প্রদান করতে হবে

সম্প্রতি ঢাকা ও চট্টগ্রামের সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচিত মেয়রগণ তাদের স্ব-স্ব নির্বাচনী ইশ্্তেহারেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ সেবা ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচী বাস্তবায়ন করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অপ্রতুল বরাদ্দ

প্রতিবছর জাতীয় বাজেটের আকার বাড়ার সাথে সাথে প্রতিবন্ধী মানুষদের উন্নয়নের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতাধীন সামাজিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক ক্ষমতায়ন খাতেও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হয়। কিন্ত প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য এই বরাদ্দ দেশের ১ কোটি ৪৫ লক্ষ প্রতিবন্ধী জনসংখ্যার তুলনায় খুবই নগন্য ও অপ্রতুল। ২০১৪ থেকে ২০১৫ সালের বাজেটসমূহেসামাজিক নিরাপত্তা ও সামাজিক ক্ষমতায়ন বাজেট ১৫৫৩১.৩ কোটি টাকা যা মোট বাজেটের মাত্র ৬.১ শতাংশ। এই ১৫৫৩১.৩ কোটি টাকা থেকে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য ৩৭১.৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয় যা সামাজিক নিরাপত্তা ও সামাজিক ক্ষমতায়ন বাজেটের শুধুমাত্র ২.৪ শতাংশ। বরাদ্দকৃত এই বাজেট ১ কোটি ৪৫ লক্ষ প্রতিবন্ধীর বাৎসরিক মাথাপিছু ভাগে পড়ে ২৫৫.৮ টাকা যা দৈানক হিসাবে মাথাপিছু পড়ে মাত্র ৭০ পয়সা। এই অপ্রতুল বাজেট বরাদ্দ দিয়ে দেশের প্রতিবন্ধী মানুষের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চলাফেরা, যোগাযোগ সহজ করা এবং তাদের অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা কিভাবে সম্ভব?

সুপারিশ

জাতীয় বাজেটে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নের জন্য যেসব খাতে বাজেট বরাদ্দ রাখা হয় তা দেখে মনে হয়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়ন হিস্যা ও ন্যায্য অধিকারকে এখনও কল্যাণের দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে। তাদের অধিকার ও সামাজিক মর্যাদার নিশ্চয়তাসহ সামগ্রিক উন্নয়ন এখনো অনেক দূরে। সূতরাং প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য জাতীয় বাজেটে নি¤েœবর্ণিত খাতসমূহে বিশেষ বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন;

  • প্রতিবন্ধী মানুষের জনসংখ্যার ভিত্তিতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে;
  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ এবং নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল ট্রাষ্ট ২০১৩-এর বিধি ও জাতীয় কর্ম পরিকল্পনা প্রণয়ণ ও বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে;
  • একীভূত শিক্ষা বাস্তবায়নে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত সংস্কার, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ব্রেইল পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষা সহায়ক উপকরণ বিতরণ কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে;
  • বাংলা ইশারা ভাষার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ও প্রসারের জন্য বিশেষ বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে;
  • প্রতিবন্ধিতা সংক্রান্ত বিশেষায়িত সেবাসমূহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং কমিউনিটি ক্লিনিকসহ সকল স্তরে রেফারেল পদ্ধতি নিশ্চিতকরণে যথাযথ বাজেট বরাদ্দরাখতে হবে;
  • প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আতœকর্মসংস্থান ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য ঋণ সুবিধার জন্য বরাদ্দরাখতে হবে;
  • জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালার যথাযথ বাস্তবায়নসহ গণস্থাপনা ও গণপরিবহনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করণে বাজেট বরাদ্দরাখতে হবে;

জাতীয় বাজেট ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী