দলিত জনগোষ্ঠির ওপর আরোপিত অসমতা ও বৈষম্য নিরসরণের কোন দিক নির্দেশনা জাতীয় বাজেটে নেই

বাংলাদেশে প্রায় ৩০ – ৩৫টি সম্প্রদায়ের প্রায় ৩.৫-৫.৫ মিলিয়ন অন্ত্যজ বা দলিত, হরিজন জনগোষ্ঠী বাস করে । সমাজ সেবা অধিদফতরের জরিপ মতে বাংলাদেশে প্রায় ৪৩.৫৮ লক্ষ দলিত জনগোষ্ঠী, ১২.৮৫ লক্ষ হরিজন জনগোষ্ঠী রয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে- রিশি, কায়পুত্র, হরিজন, রবিদাস ইত্যাদি। দলিত জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র্য সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্রতাকে সমৃদ্ধ করেছে, যা নৃতাত্ত্বিক গবেষণার দাবি রাখে। বাংলাদেশের অসম সমাজ কাঠামোয় ‘জাতি-বর্ণ প্রথা’ স্থায়ী রূপে বিদ্যমান থাকার প্রধান শিকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তথা অন্ত্যজ বা দলিত ও হরিজন জনগোষ্ঠী; যারা মানবাধিকার লঙ্ঘন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রথম সারির ভূক্তভোগি। সামাজিক-সাংস্কৃতিক কারণে দলিত জনগোষ্ঠির ওপর আরোপিত অসমতা ও বৈষম্য নিরসরণের কার্যকর কোন দিক নির্দেশনা জাতীয় বাজেটে নেই।

অন্ত্যজ বা দলিত জনগোষ্ঠীর সঠিক পসিংখ্যান না থাকায় বাজেট বরাদ্দে উপেক্ষিত ও বৈষম্যের শিকার

এ যাবত দেশে পাঁচবার আদমশুমারি হওয়ার পরও অন্ত্যজ বা দলিত সম্প্রদায় প্রত্যেকটি জরীপ থেকে বাদ পড়ে আসছে। বেসরকারী সংগঠনের রিপোর্টেও এই সম্প্রদায়ের জনসংখ্যার আকার ভিন্ন দেখা যায়। প্রতিবছর বাজেট বরা্েদ্দর সময় এই জনগোষ্ঠীকে ক্ষুদ্র সংখ্যার জনগোষ্ঠীর যেমন, বেদে ও হিজরা জনগোষ্ঠীর সাথে মিশিয়ে বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়। দেশে অন্ত্যজ বা দলিত জনগোষ্ঠীর সঠিক পসিংখ্যান না থাকায় জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পপনা ও বাজেট বরাদ্দে এ জনগোষ্ঠী উপেক্ষিত ও বৈষম্যের শিকার । ফলে, এখনো পর্যন্ত এই সম্প্রদায় সামািজক ও অর্থনৈতিকভাবে চরম অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার এবং উন্নয়নে উপেক্ষিত।

বাংলাদেশের দলিত ও হরিজন জনগোষ্ঠী দীর্ঘকাল সময় থেকে উন্নয়ন কর্মসূচী থেকে বঞ্চিত। তবে সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে দলিত, হরিজন জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য পদক্ষেপ নেয়া হলেও তারা এখনও নানাধরণের বৈষম্য ও মানবাধিকার লংঘনের শিকার হয়।

অন্ত্যজ বা দলিত জনগোষ্ঠীর জন্য জনসংখ্যার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল বাজেট বরাদ্দ এবং ক্রমান্বয়ে কমছে

Sectoral_budget_dalit_01
লেখচিত্র ১: দলিত সম্প্রদায়ের জন্য বাজেট বরাদ্দ কোটি টাকায়)

অন্ত্যজ বা দলিত জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় সরকার ২০০৯ সাল থেকে বাজেট বরাদ্দ করছে; কিন্তু এ বাজেটের পরিমান দলিত জনসংখ্যার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। দ্বিতীয়ত: বরাদ্দের পরিমান ক্রমান্বয়ে কমছে; ২০১৩-এ ছিল ২৯.২২ কোটি টাকা, যা ২০১৫-এ হয়েছে ৯.২৩ কোটি টাকা (লেখচিত্র ১)।

২০১৪-২০১৫ সালের জাতীয় বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কার্যক্রমের আওতায় দলিত, হরিজন ও বেদে জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের জন্য ৯ কোটি ২৩ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা। এই বরাদ্দ যদি ৫৫ লক্ষ দলিত ও হরিজন জনগোষ্ঠীকে বন্টন করা হয়, তাহলে বাৎসরিক মাথাপিছু বরাদ্দ হয় ১৫.৭৮ টাকা মাত্র। আর এই বাৎসরিক বরাদ্দকে যদি দৈনিক হারে বন্টন করা হয় তাহলে মাথাপিছু দৈনিক বরাদ্দ হয় শুধুমাত্র ০.০৫ টাকা। এতে অনগ্রসর শ্রেণীর মধ্যে আরও অনগ্রসর হলো দলিত হরিজন জনগোষ্ঠী। সুতরাং দলিত হরিজন জনগোষ্ঠীর জন্য এই বাজেট বরাদ্দ খুবই নগন্য, এবং এটি দলিত হরিজন জনগোষ্ঠীর সাথে প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়।

দ্বিতীয়ত: সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় মোট বরাদ্দের ক্ষেত্রে দলিত জনগোষ্ঠির হিস্যা ক্রমান্বয়ে কমছে; ২০১৪ অর্থবছরে এ হার ছিল ০.১০%, ২০১৫ অর্থবছরে এর পরিমান ০.৬% (ছক ১)।

ছক ১: এক নজরে সামাজিক নিরাপত্তা ও সামাজিক ক্ষমতায়ন খাতের আওতায় দলিত হরিজন সম্প্রদায়ের বাজেট হিস্যা (কোটি টাকা)

ছক ১: এক নজরে সামাজিক নিরাপত্তা ও সামাজিক ক্ষমতায়ন খাতের আওতায় দলিত হরিজন সম্প্রদায়ের বাজেট হিস্যা  (কোটি টাকা)
বাজেট অর্থ-বছর
২০০৮-৯ ২০০৯-১০ ২০১০-১১ ২০১১-১২ ২০১২-১৩ ২০১৩-১৪ ২০১৪-১৫
মোট বাজেট (অনুন্নয়ন ও উন্নয়ন) ৯৯,৯৬২ ১১৩,৮১৯ ১৩২,১৭০ ১৬৩,৫৮৯ ১৯১,৭৩৮ ২২২,৪৯১ ২৫০,৫০৬
সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ বরাদ্দ ৮,১৯৬.৮৮ ৮,৮৭৭.৮৮ ৯,৬৪৮.৪১ ১১,১২৪.০৫ ১০,৯২৯.০৭ ১২,৪৫৯.৫০ ১৫,২৮০.৮৭
সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ বরাদ্দ  মোট অনুন্নয়ন ও উন্নয়ন বাজেটের অংশ (শতাংশ হারে) ৮.২% ৭.৮% ৭.৩% ৬.৮% ৫.৭% ৫.৬% ৬.১%
দলিত হরিজন, বেদে এবং হিজরা সম্প্রদায়ের জীবন মান উন্নয়নে বরাদ্দ ২১.৫০ ২৯.২২ ১২.২৬ ৯.২৩
সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাতে দলিত হরিজন, বেদে এবং হিজরা সম্প্রদায়ের জীবন মান উন্নয়ন বরাদ্দ  (শতাংশ হারে) ০.১৯ % ০.২৭ % ০.১০% ০.০৬ %

তাছাড়া ২০১২ সাল থেকে জাতীয় বাজেটে দলিত ও হরিজন জনগোষ্ঠীর জীবন মান উন্নয়ন এবং মহানগর ও জেলা শহরে সুইপার কলোনী নির্মাণ খাতে বরাদ্দ রাখা শুরু করে। তবে এ বরাদ্দের সাথে বেদে এবং হিজরা জনগোষ্ঠীকেও অন্তর্ভক্ত করা হয়। ফলে বরাদ্দের পরিমান কমে যাচ্ছে।

বিগত ২০১২ সালে, প্রধানমন্ত্রীর দফতর ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ বিভাগ থেকে জারিকৃত পরিপত্রদ্বয়ের মাধ্যমে সরকার কর্তৃক পরিচালিত সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় ভিজিএফ প্রকল্পে উপকারভোগীর ক্ষেত্রে দলিত ও হরিজন জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্তি নিশ্চিতকরণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য এ ক্ষেত্রে বাজেটে আরও পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন ছিল।

“বৈষম্য বিলোপ খসড়া আইন ২০১৪” এর বাস্তবায়নে বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন

বাংলাদেশ সরকারের ৫ম ও ৬ষ্ঠ পঞ্চম বার্ষিকী পরিকল্পনায় দেশের দলিত হরিজন জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য যথাযথ উন্নয়ন কর্মসূচী প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তুদলিত ও হরিজন জনগোষ্ঠীর মানুষদের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য এসব প্রতিশ্রুতি ও উন্নয়ন কর্মসূচীর বাস্তবায়ন তেমন একটা অর্থপূর্ণভাবে ভূমিকা রাখতে পারে নাই। বাংলাদেশে দলিত ও হরিজন জনগোষ্ঠীর স্বার্থ ও অধিকার সম্পর্কিত কোন রাস্ট্রীয় নীতি বা আইন নেই। তবে এই জনগোষ্ঠীর প্রতি যে বৈষম্য প্রদর্শন করা হয় তা বিলোপ করে তাদের অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত বছর বাংলাদেশ সরকার “বৈষম্য বিলোপ খসড়া আইন ২০১৪” নামে একটি আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু এ উদ্যোগের কোন অগ্রগতি আর পরিলক্ষিত হয় না। এ আইন বাস্তবায়নে আসন্ন বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে।

নির্বাচনী অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন চাই

অনগ্রসর ও অনুন্নত দলিত,হরিজন সন্তানদের শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে বিশেষ কোটা এবং সুযোগ সুবিধা অব্যাহত থাকবে বলে বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নির্বচনী অঙ্গীকার ছিল । আমরা এ অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন চাই।

দলিত জনগোষ্ঠির জন্য মন্ত্রণালয় ভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে

২০১৪-২০১৫ সালের বাজেটে দলিত ও হরিজন জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ রেখে দলিত, হরিজন ও বেদে জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের কার্যক্রম সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় আনা হয়। দলিত হরিজন জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের জন্য মন্ত্রণালয় ভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ রাখা অত্যন্ত জরুরী। অন্যথায়, দলিত হরিজন জনগোষ্ঠী তাদের অনগ্রসতা থেকে মুক্তি পাবে না।

সুপারিশ

  • দলিত হরিজন মানুষের জনসংখ্যার ভিত্তিতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। দলিত হরিজন জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও তাদের সামাজিক নিরাপত্তা দিতে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখতে হবে;
  • রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত হরিজন জনগোষ্ঠীর চাকুরী নিয়মিতকরণের জন্য বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে;
  • পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত হরিজন কলোনির বাসিন্দাদের নিরাপদ আবাসস্থল, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কাজের নিশ্চয়তার জন্য বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখতে হবে;
  • বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মক্ষম দলিত ও হরিজন জনগোষ্ঠীর দক্ষতা বৃদ্ধি ও আয়বর্ধনমূলক কর্মকান্ডে সহায়তার জন্য বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখতে হবে।
জাতীয় বাজেট ও দলিত জনগোষ্ঠী