Sectoral_budget_agriculture_01জাতীয় বাজেট একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এখানে জাতীয় উন্নয়ন নীতিমালা ও পরিকল্পনার প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। কয়েক দশকে আমাদের অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটেছে। জিডিপি’তে কৃষি খাতে অবদান কমেছে, শিল্প ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। কিন্তু এখনো বাংলাদেশের শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ মানুষের জীবন-জীবিকা কোন না কোন ভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। শ্রমশক্তি জরিপ (২০১০) এর হিসাব মতে, দেশের মোট শ্রমমক্তির ৪৭.৫ শতাংশ এখনো কৃষিতে নিয়োজিত আছে।

অথচ জাতীয় বাজেটে কৃষি খাত অবহেলিতই থেকে যাচ্ছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ২,৫০,৫০৬ কোটি টাকা যা ২০১৩-১৪ অর্থবছরের চেয়ে ৫.৩৪ শতাংশ বেশি । এসময় কৃষিখাতে সরকারের মোট ব্যয় বরাদ্দ ১২,৩৯০ কোটি টাকা। এর মধ্যে উন্নয়ন ব্যয় ১৫২৪ কোটি টাকা এবং অনুন্নয়ন ব্যয় ১০,৮৬৬ কোটি টাকা। এই বরাদ্দের পরিমান পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে (১১১ কোটি টাকা) বেশি হলেও বাজেটের মোট আকারে কৃষির অংশীদারিত্ব হ্রাস পেয়েছে ০.৭৩ শতাংশ (চিত্র: ১)। অন্যদিকে কৃষিসহ কৃষি সংশ্লিষ্ট মোট ৫টি মন্ত্রণালয়ের বাজেট চিত্র: ২-এ দেখানো হয়েছে। এখানে লক্ষণীয় যে, কৃষি মন্ত্রণালয়ে বাজেট বরাদ্দের ধারা নিম্নগামী হলেও অন্য ৪টি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ধীর গতিতে হলেও বাড়ছে ।

Sectoral_budget_agriculture_02যদিও বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ গ্রামে বাস করে এবং মোট শ্রমক্ষম মানুষের শতকরা ৪৭.৫ ভাগ এখনো কৃষিতে নিয়োজিত আছে, তথাপি লক্ষণীয় যে, জিডিপিতে কৃষির অবদান দিন দিন কমছে। ৮০’র দশকের শুরুতে জিডিপি’তে কৃষি খাতের অবদান ছিল ৩৩.০৭ শতাংশ, ৯০’র দশকে তা নেমে আসে ২৯.২৩ শতাংশে এবং ২০১৩-১৪ অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষির অবদান মাত্র ১৬.৩৩ শতাংশ (চিত্র: ৩)। এটি একদিকে যেমন আমাদের অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনকে নির্দেশ করে তেমনি এটাও স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে এখানে উদ্বৃত্ত শ্রম জমা পড়ে আছে। প্রচ্ছন্ন বেকারত্বের হার এখানে অনেক বেশি। উদ্বৃত্ত শ্রমকে উৎপাদনশীল কাজে লাগানোর কৃষিতে বর্ধিত বিনিয়োগের কোন বিকল্প নেই।

আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বচনী ইশতেহারের (২০১৪) অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রতি ছিলো সার, বীজ, সেচসহ কৃষি উপকরণে ভর্তুকী প্রদানের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে । জাতীয় বাজেটের আকার ক্রমশ বৃদ্ধি কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে সার-তেলের কমে গেলেও বিগত কয়েক বছর ধরে এই ভর্তুকীর পরিমান ৯,০০০ কোটি টাকায় স্থির রয়েছে এবং জাতীয় বাজেটে এর অংশিদারীত্ব ক্রমহ্রসমান। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মোট বাজেটের ৪.২ শতাংশ কৃষিতে ভর্তূকীর জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছিলো যা গত অর্থবছরের তুলনায় ০.৬ শতাংশ কম ।

Sectoral_budget_agriculture_03মাননীয় অর্থমন্ত্রী তার ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় বলেন, “কৃষি গবেষণাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে”। কিন্তু মধ্যমেয়াদী বাজেট কাঠামোতে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের জন্য যেখানে বরাদ্দ রাখা হয়েছিলো ১১৩.৮৪১২ কোটি টাকা, সেখানে সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ আরো হ্রাস পেয়ে দাড়ায় ৯২.৭২০২ কোটি টাকায়। ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে যথাক্রমে ৫৫.১৪৬০, ১৫.১০৩৭ ও ১৫.৪৮ কোটি টাকা। একই চিত্র দেখা যায় অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও।

জাতীয় কৃষি নীতি ও ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কৃষির বাণিজ্যিকীকরণকে মূল বিবেচনায় রাখা হয়েছে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কৃষিতে বিনিয়োগ পরিকল্পনায় ২০১০-১১ অর্থবছরে কৃষি মন্ত্রনালয়ের উন্নয়ন বরাদ্দ ধরা হয় ১ হাজার ৫৪ কোটি টাকা এবং সর্বশেষ (২০১৪-১৫) বছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৩ হাজার ২২১ কোটি টাকা হওয়ার কথা। কিন্তুু উন্নয়ন বাজেটে ২০১০-১১ অর্থবছরের জন্য কৃষি মন্ত্রন্লয়কে বরাদ্দ দেয়া হয় ১ হাজার ২৫ কোটি টাকা আর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিলো ১ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। সুতরাং অন্তত বিনিয়োগের দিক দিয়ে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ীত হচ্ছে তা বলা যাবে না। এ পরিকল্পনায় কৃষির বানিজ্যিকীকরনের উপর জোর দেয়া হয়েছিলো যা খামার ভিত্তিক চাষাবাদকে উৎসাহীত করেছে। কিšু‘ এর ফলে প্রতিযোগীতায় পিছিয়ে পড়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকরা। কৃষি নিয়ে নীতি-নির্ধারণী মহলের এ অবহেলার কারনে কৃষির প্রবৃদ্ধি ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। জাতীয় প্রবৃদ্ধি অনেক দিন ধরে ৬ এর উপরও থাকলেও ২০০৯-১০ অর্থবছরে কৃষির প্রবৃদ্ধি ছিলো ৫.২৪ শতাংশ। ২০১০-১১, ২০১১-১২ ও ২০১২-১৩ অর্থবছরে তা হ্রাস পেয়ে দাড়ায় যথাক্রমে ৫.১৩, ৩.১১ ও ২.১৭ শতাংশে (চিত্র: ৫)।

Sectoral_budget_agriculture_04Sectoral_budget_agriculture_05

বৈদেশিক দাতা সংস্থাগুলোর পরামর্শে গৃহীত নীতির কারনে অবাধ বানিজ্যের প্রতিযোগীতায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের সাধারণ কৃষক। উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদন উপকরনের মূল্য বৃদ্ধি ও পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা কৃষি থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। এমতাবস্থায় সরকারের উচিত এদেশের প্রান্তিক কৃষকের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ও সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বানিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে সরে এসে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকের স্বার্থে প্রয়োজনীয় নীতি প্রণয়ন করা এবং সে অনুযায়ী কৃষিতে সরকারী বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।

আমাদের দাবীসমূহ

  • ধান-চাল ক্রয়ে বাজেট বৃদ্ধি করা এবং উপসহকারী কর্মকর্তার মাধ্যমে তালিকা প্রণয়ন করে কৃষকের নিকট থেকে সরাসরি ক্রয় করা।
  • সেচ, সার, বীজ সহ সকল ক্ষেত্রে প্রদেয় ভর্তুকী সরাসরি কৃষকের নিকট পৌছানো।
  • কৃষকের জন্য পল্লী রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা।
  • কৃষিভিত্তিক শিল্প-কলকারখানা স্থাপন।
  • জৈব প্রযুক্তি সম্প্রসারণে বাজেট বৃদ্ধি করা।
  • বিএডিসিকে শক্তিশালী ও সক্রিয়করণে বাজেট বৃদ্ধি।
  • কৃষক আদালত গঠন করা।
  • কৃষি বীমা চালু করা।
  • মৌসুমভিত্তিক সুদবিহীন কৃষিঋণ প্রদান।
  • ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে কৃষিমার্কেট স্থাপন এবং
  • ইউনিয়ন পর্যায়ে হিমাগার স্থাপন।
জাতীয় বাজেট ও কৃষি খাত