আদিবাসী জনসংখ্যা নিয়ে তথ্য বিভ্রান্তি

১৯৯১ সালের সরকারি আদমশুমারী অনুযায়ী বাংলাদেশে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১২ লক্ষ; ২০০১ সালের আদমশুমারীতে এ সংখ্যা ছিল ১৪ লক্ষ এবং ২০১১ সালের আদমশুমারীতে ১৭ লক্ষ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যূরোর ২০১১ সালের জনসংখ্যা ও খানা জরীপ হিসাবে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১.১০% অর্থাৎ ১৫,৮৬,১৪১ জন আদিবাসী রয়েছে। তবে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের মতে, বাংলাদেশে ৪৬টি জাতিগোষ্ঠীর ৩০ লক্ষাধিক আদিবাসী জনসংখ্যা রয়েছে । আদিবাসীদের এই জনসংখ্যার প্রায় ২০ লক্ষ সমতলে এবং প্রায় ১০ লক্ষ পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বাতন্ত্র্য বাংলাদেশের বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। বাংলাদেশে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী দীর্ঘকাল থেকে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে বঞ্চিত। তবে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য পদক্ষেপ নেয়া হলেও তারা এখনও দারিদ্র্যসীমার অনেক নিচে বাস করছে এবং নানাধরণের বৈষম্য ও মানবাধিকার লংঘনের শিকার হচ্ছে।

সঠিক পরিসংখ্যান না থাকায় উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেট বরাদ্দে অবহেলা ও বৈষম্যে

বাংলাদেশ সরকার উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়ন করে দেশের মোট জনসংখ্যার হিসাবের ভিত্তিতে। এ যাবত পাঁচবার আদমশুমারি হওয়ার পরও দেশে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর সঠিক সংখ্যা এখনও পরিষ্কার নয়। আদিবাসী মানুষের সঠিক সংখ্যা না থাকায় জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেট বরাদ্দে অনেক গরমিল থাকে। রাষ্ট্রের নাগরিক হয়েও আদিবাসীরা চরমভাবে অবহেলিত; ফলে তাদের প্রতি সরকারের এক প্রকার অনাগ্রহ দেখা য়ায়। এ অনাগ্রহের প্রতিফলন দেখা যায় জাতীয় বাজেটে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দের চিত্র থেকে। বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত এবং বাজেটে তাদের জন্য নামমাত্র বরাদ্দ রাখা হয়। ফলে, আদিবাসী জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিকভাবে চরম অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে এবং সার্বিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় উপেক্ষিত থাকছে। বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় সমতা এবং আদিবাসিদের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত হলেই আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব হবে।

অপ্রতুল বাজেট বরাদ্দ

Sectoral_budget_adivashi_01প্রতি বছর জাতীয় বাজেটের আকার বাড়ছে এবং এর ব্যয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও খাতওয়ারী হয়ে থাকে। বিগত ২০০৯-১০ থেকে ২০১৪-১৫অর্থবছরের বাজেটসমূহে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে আদিবাসীদের জন্য উন্নয়ন বরাদ্দ রাখা হয়। ২০১৪ও ২০১৫সালের বাজেটে স্থানীয় সরকার বিভাগের “পার্বত্য চট্টগ্রাম পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প (২য় পর্যায়)” এর বরাদ্দ সামাজিক নিরাপত্তা ও সামাজিক ক্ষমতায়নের আওতায় আলাদভাবে রাখা হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন বরাদ্দ এবং তা বাস্তবায়নের জন্য ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ রয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩ জেলার জন্য উন্নয়ন খাতে ৫২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়, যা জাতীয় বাজেটের ০.৪২% মাত্র (চিত্র-১)। তবে ২০১০ থেকে ২০১৫ অর্থবছরে পার্বত্য চট্টগ্রামেরজন্য প্রতিবছর বাজেট বরাদ্দ খুব সামান্যই বৃদ্ধি করা হয়েছে। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যা ১,৫৯৮,২৩১ জন । উন্নয়ন খাতে বরাদ্দকৃত এই ৫২৬ কোটি টাকা যদি পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী ও বাঙালির মধ্যে বণ্টন করা হয় তাহলে দৈনিক মাথাপিছু পায় মাত্র ৮.৫৯ টাকা।

বাজেট বরাদ্দে সমতলের আদিবাসিরা সবচেয়ে বেশী বৈষম্যে ও অবহেলার শিকার

Sectoral_budget_adivashi_03১৯৯৬ সাল থেকে সমতলের আদিবাসীদের জন্য উন্নয়ন বরাদ্দ ছিল মাত্র ৫ কোটি টাকা; যা ক্রমান্বয়েচলতি অর্থবছরে ১৬ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন বিশেষ কার্যাদি বিভাগের “বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)” শীর্ষক কর্মসূচির বাজেট থেকে এ বরাদ্দ দেয়া হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বাজেটে সমতলের ২০ লক্ষাধিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নয়ন বরাদ্দ শুধু ১৬ কোটি টাকা, যা নিতান্ত কম এবং জাতীয় বাজেটের ০.০০৬ শতাংশ মাত্র। এই বরাদ্দ সমতলের ২০ লক্ষ আদিবাসীর মধ্যে বণ্টন করলে দৈনিক মাথাপিছু পড়ে মাত্র ০.২২ টাকা।

আগে যেখানে মাত্র ২৮টি জেলার ৪১টি উপজেলার আদিবাসীদের এ সহায়তা প্রদান করা হতো এখন সেখানে ৪৮টি জেলার ২১৬টি আদিবাসী অধ্যুষিত উপজেলা যুক্ত হয়েছে। ফলে, এ কর্মসূচির আওতায় আদিবাসী অধ্যুষিত উপজেলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও আদিবাসী জনসংখ্যা অনুযায়ী বরাদ্দের পরিমাণ বাড়েনি।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি কতটুকু সে সম্পর্কে সঠিক তথ্য নেই সরকার কর্তৃক পরিচালিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় প্রকল্প যেমন ভিজিএফ, ভিজিডি ইত্যাদিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি কতটুকু সে সম্পর্কে কোনো সঠিক তথ্য নেই। একদিকে সরকারি সেবাসমূহে আদিবাসীদের সমঅভিগম্যতা নেই অন্যদিকে বাজেট বরাদ্দেও অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। এতে অনগ্রসর আদিবাসী জনগোষ্ঠী আরও অনগ্রসরতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। সুতরাং এই নগন্য বাজেট বরাদ্দ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়।

বাজেট বরাদ্দে আদিবাসী সম্পর্কিত রাষ্ট্রীয় নীতি ও চুক্তির প্রতিফলন দেখা যায় না

বাংলাদেশে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের অধিকার ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সম্পর্কিত বেশকিছু রাষ্ট্রীয় নীতি বা আইন যেমন – পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ১৯৯৭, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন ১৯৯৮, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০ ইত্যাদি রয়েছে। এ নীতিসমূহ বাস্তবায়নের বাজেটে কোন বরাদ্দ রাখা হয় না।
সরকারের ৫ম ও ৬ষ্ঠ পঞ্চ-বার্ষিকী পরিকল্পনায় দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য যথাযথ উন্নয়ন কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়। জাতীয় বাজেটে এর কোনপ্রকার প্রতিফলন দেখা যায় নাই।

ক্ষমতাসীনদের নির্বাচনী অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন চাই

বর্তমান সরকারের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল তাদেরনির্বাচনী ইশতেহার ২০০৮ ও ২০১৪ এর মাধ্যমে সমতলের ক্ষদ্র্র নৃ-গোষ্ঠীর জমি, জলাধার ও বন এলাকায় অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণসহ ভূমি কমিশনের কার্যμম অব্যাহত রাখা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সন্তানদের শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে বিশেষ কোটা এবং সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়। এছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অবশিষ্ট অঙ্গীকার ও ধারাসমূহ বাস্তবায়িত করা, পার্বত্য জেলাগুলোর উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, তিন পার্বত্য জেলার ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুন্ন রাখা, বনাঞ্চল, নদী-জলাশয়, প্রাণিসম্পদ এবং গিরিশৃঙ্গগুলোর সৌন্দর্য সংরক্ষণ করে তোলা, তিন পার্বত্য জেলায়পর্যটন শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্পের বিকাশে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা হবে বলে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দেয় ।

আদিবাসীদের জন্য প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি, চুক্তি ও নীতি বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রণালয় ভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে

আদিবাসীরা যদি মোট জনসংখ্যার ২% হয় তাহলে জাতীয় বাজেট থেকে তাদের জন্য ন্যায্য বার্ষিক বরাদ্দ ৬০০০ কোটি টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অধিকন্তু আদিবাসীদের উন্নয়ন ও অধিকার সংক্রান্ত যে সকল প্রতিশ্রুতি, চুক্তি ও নীতি রয়েছে সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য সরকারের তরফ থেকে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন। এর সাথে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামগ্রিভাবে জীবনমান উন্নয়নের জন্য মন্ত্রণালয় ভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ রাখা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায়, আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরাঅনগ্রসরতা থেকে মুক্তি পাবে না।

পরিশেষে বলা যায়, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ন্যায্য উন্নয়ন হিস্যা ও অধিকারকে নিশ্চিত করলেই তারা অনগ্রসতার অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে। তাদের জাতিগত পরিচয়, অধিকার ও সামাজিক মর্যাদার নিশ্চয়তাসহ সামগ্রিক উন্নয়ন এখনো অনেক দূরে। সূতরাং আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী মানুষের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য জাতীয় বাজেটে নিম্নবর্ণিত খাতসমূহে বিশেষ বরাদ্দ রাখা অতীব প্রয়োজন;

  • পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ১৯৯৭ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১ -এর যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য;
  • পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদ এর সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা শক্তিশালীকরণের জন্য;
  • জাতীয় বাজেটে পৃথক অনুচ্ছেদ যুক্ত করে আদিবাসী জনগণের উন্নয়নের জন্য;
  • সকল মন্ত্রণালয়ের/বিভাগের বাজেটে আদিবাসীদের জন্য সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখতে হবে;
  • উচ্চ শিক্ষা ও কারিগরী শিক্ষায় বৃত্তিসহ আদিবাসী নারী ও তরুণদের আত্ম-কর্মসংস্থানের জন্য;
  • প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে আদিবাসী শিশুদের আদিবাসী ভাষায় শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য;
  • ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক একাডেমিগুলোতে আদিবাসী সংস্কৃতি উন্নয়ন ও গবেষণার জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে।

জাতীয় বাজেট ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী