বাংলাদেশে দলিত জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও জাতীয় বাজেট

 

ভূমিকা
বাংলাদেশের দলিত জনগোষ্ঠী শত শত বছর ধরেই এই ধরণের অর্থনৈতিক সহিংসতার শিকার এবং এর মূলে রয়েছে তাঁদের প্রতি বিদ্যমান জাত-পাত ভিত্তিক বৈষম্য। জাত-পাতভেদে বৈষম্যের চর্চা এদেশ বহুযুগের পুরনো যা আজও এদেশের ৬৫ লক্ষ জনগোষ্ঠীকে অস্পৃশ্য ও চরম দরিদ্র করে রেখেছে। জাত-পাত ও পেশাভিত্তিক বৈষম্য সৃষ্টি করে একজন মানুষকে ‘মানুষ’ হিসেবে গণ্য না করার এক হীন সংস্কৃতি যা সমাজের প্রায় সর্বত্রই ব্যাপকভাবে বিদ্যমান। কেননা সমাজের চোখে তারা দলিত, তারা নিন্ম শ্রেণীর ও নিন্ম বর্ণের। দলিত শব্দের আভিধানিক অর্থ সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া ও অবহেলার শিকার, আর্থিকভাবে দুর্বল কিংবা নির্যাতিত জনগোষ্ঠী। মূলধারার জনগণ তাদেরকে অ¯পৃশ্য, জাতিচ্যুত কিংবা অপবিত্র হিসেবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশ সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তরের ‘দলিত, বেদে ও হরিজন জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন নীতিমালা’ এ উল্লেখিত সংজ্ঞা অনুযায়ী দলিত সম্প্রদায় বলতে সমাজে যারা দলিত হিসেবে পরিচিত এবং যিনি নিজেকে দলিত পরিচয় দিতে ইতঃস্তত বোধ করেন না তাকে বুঝানো হয়। আর সাধারণ অর্থে দলিত বলতে আমরা সাধারণত বুঝি সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে যারা মূলধারার জনগোষ্ঠীর কাছে ‘অ¯পৃশ্য’ বলে বিবেচিত। সমাজসেবা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুসারে, ৬৩.৬৮ লক্ষ দলিত (৪৩.৫৮ লক্ষ দলিত, ১২.৮৫ লক্ষ হরিজন এবং ৭.৮৫ লক্ষ বেদে) এর সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে, যারা প্রায় ৮০টির ও বেশি দলিত সম্প্রদায়ের অন্তর্ভূক্ত। এদের মধ্যে বাঙালি ও অবাঙালি উভয় দলিতই রয়েছে। নাগরিক উদ্যোগ ও বিডিইআরএম-এর যৌথ গবেষণাপত্র ‘বাংলাদেশের দলিত জনগোষ্ঠী: বৈষম্য, বঞ্চনা ও অ¯পৃশ্যতা’ অনুসারে, এসব দলিত জনগোষ্ঠীর ৯০% এরই নিজস্ব কোনো ভূমি নেই। এছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৭% দলিত জনগোষ্ঠী স্থানীয় সেলুন, চায়ের দোকান ও রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করতে পারে না। ৪৭% দলিত মন্দির, ধর্মীয় উপাসনালয় ও সামাজিক কোনো আচার অনুষ্ঠানে প্রবেশাধিকার পায় না। ৬৯% শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও অন্যান্য শিক্ষার্থীদের কাছে চরম বৈষম্যের শিকার। প্রায় ৯০% দলিত শিশুরা স্কুলে ভর্তি হলেও দারিদ্র্য ও অ¯পৃশ্যতার কারণে প্রাথমিক স্তর থেকেই ঝরে পড়ে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস ও পেশাগত কারণে প্রায় ৩৬% দলিত সাধারণ জ্বরসহ বিভিন্ন রোগব্যাধিতে ভুগে থাকে। কিন্তু সরকারি বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা ও কমিউনিটি ক্লিনিক থাকা সত্ত্বেও ২২% মানুষ দলিত পরিচয়ের কারণে স্বাস্থ্যসেবায় অ¯পৃশ্যতার শিকার হয়ে থাকে। ফলে হাসপাতালে যাওয়ার ক্ষেত্রে তারা অনীহা প্রকাশ করে। মাত্র ৩৮% দলিত অসুস্থ হলে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যায়। বাংলাদেশের সংবিধানে সকল নাগরিককে সমান মর্যাদা ও অধিকার দেয়ার কথা বলা হলেও প্রকৃত অর্থে দলিত জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়তই সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

 

সঠিক পরিসংখ্যানের অভাব, জাতীয় বাজেটে উপেক্ষিত দলিত জনগোষ্ঠী
বাংলাদেশে এ যাবৎকালে যতবার আদমশুমারি হয়েছে, তার কোনোটাতেই দলিত সম্প্রদায়কে আলাদাভাবে দেখানো হয়নি। ফলে দলিত জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কাজ করার জন্য তাদের নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখা গেছে, এদেশে দলিতদের সঠিক সংখ্যা এবং তাদের সকল সম্প্রদায়ের সঠিক কোনো পরিসংখ্যান সরকারি কোনো তথ্য ভান্ডারে পাওয়া যায় না। বেসরকারি সংগঠনের প্রতিবেদনেও এই সম্প্রদায়ের জনসংখ্যার আকারে বিভিন্নতা দেখা যায়। সমাজ সেবা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, দেশে ৬৩.৬৮ লক্ষ দলিত বসবাস করছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সঠিকভাবে কোনো দলিতশুমারি পরিচালনা না হওয়ায় দলিতদের প্রকৃত সংখ্যা জানা আদৌ সম্ভব হয়নি। প্রতিবছর বাজেট বরাদ্দের সময় এই জনগোষ্ঠীকে অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যেমন, বেদে ও হিজরা জনগোষ্ঠীর সাথে একত্রিত করে বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়। ফলে কোন জনগোষ্ঠীর জন্য কতটুকু বরাদ্দ তা সুনির্দিষ্ট থাকে না। দেশে দলিত জনগোষ্ঠীর সঠিক পরিসংখ্যান না থাকায় জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেট বরাদ্দে এ জনগোষ্ঠী উপেক্ষিত ও বৈষম্যের শিকার। এখনো পর্যন্ত এই সম্প্রদায় সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে চরম অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার এবং উন্নয়নে উপেক্ষিত। বাংলাদেশের দলিত ও সমজাতীয় অন্যান্য জনগোষ্ঠী দীর্ঘকাল সময় থেকে উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে বঞ্চিত। তবে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে দলিত জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য পদক্ষেপ নেয়া হলেও তারা এখনও নানা ধরণের বৈষম্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়।

 

পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ও জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলে দলিত জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্তিকরণ

সরকার কর্তৃক গৃহীত সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে সামাজিকভাবে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় উল্লেখ রয়েছে, “ধোপা, মুচি, নাপিত ও অনুরূপ অন্যান্য সনাতনী নিন্ম বর্ণের মানুষজনের মতো সামাজিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি বিষয়ে ষষ্ঠ পরিকল্পনায় এই সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে আর্থসামাজিক উন্নয়ন ধারার সাথে যুক্ত করার বিভিন্ন কৌশল অনুসরণের মাধ্যমে তাদের অধিকার সুরক্ষার প্রচেষ্টা নেয়া হয়। এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চাহিদা মেটানোর ব্যাপারে সরকার অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ও সেই সাথে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। সামাজিক বৈষম্য থেকে তাদের সুরক্ষা দিতে আইনগত বিধান তৈরি করা হয়। তবে জনপ্রশাসনের সামর্থে ঘাটতি ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অনুপস্থিতি সরকারি নীতির সঠিক বাস্তবায়নকে নানাভাবে বিঘ্নিত করে। তাই সপ্তম পরিকল্পনায় জনপ্রশাসন ও স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করার ওপর বিশেষ প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।” (সূত্র: ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, ২০১৫/১৬-২০১৯/২০, সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ, পরিকল্পনা কমিশন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার)

বাংলাদেশের জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল-২০১৫ তে দলিত জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ কর্মসূচির কথা বলা হয়েছে। জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল-২০১৫ এর ২.৮ অনুচ্ছেদ (অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা) এর ২.৮.২ ধারায় উল্লেখ আছে, “অন্যান্যদের ন্যায় দলিত পরিবার গুলোরও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে উপকার লাভের সমান সুযোগ রয়েছে। অধিকন্তু, দলিতদের জন্য জেলা শহরে সুইপার কলোনী নির্মাণ নামক একটি বিশেষ কর্মসূচি রয়েছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে এ খাতে ১০০ মিলিয়ন টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়।” (সূত্র: জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল: বাংলাদেশ- জুলাই, ২০১৫, পরিকল্পনা কমিশন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার)

 

সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার এবং সরকারি নীতিমালায় দলিত সম্প্রদায়
আমরা সরকারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই জাতীয় বাজেটসহ বিভিন্ন সরকারি নীতিমালাসমূহে দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বাজেট বরাদ্দ এবং বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করার জন্য। বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিলো অনগ্রসর ও অনুন্নত দলিত, হরিজন সন্তানদের শিক্ষা ও চাকুরি ক্ষেত্রে বিশেষ কোটা এবং সুযোগ সুবিধা অব্যাহত রাখা। তারা দলিত জনগোষ্ঠির সার্বিক উন্নয়নের বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (২০০৮) তাদের ইশতেহারে দলিত ও সামাজিকভাবে বঞ্চিত জনগোষ্ঠী তথা তফসীলি সম্প্রদায়ের উন্নয়নের জন্য প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেছিল; যা নিন্মরূপ-
‘…..সংখ্যালঘু, আদিবাসী, ক্ষুদ্র নৃ-জাতিগোষ্ঠী এবং দলিতদের প্রতি বৈষম্যমূলক সকল প্রকার আইন ও অন্যান্য ব্যবস্থার অবসান করা হবে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং আদিবাসীদের জন্য চাকুরি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।’ -নির্বাচনী ইশতেহার, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০০৮ (অনুচ্ছেদ ১৮.১)

 

দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ খুবই সীমিত
সমাজসেবা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১২-২০১৩ অর্থ বছরে পাইলট কর্মসূচির মাধ্যমে ৭টি জেলায় ‘দলিত, হরিজন ও বেদে জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি’-এর কার্যক্রম শুরু হয়। পাইলট কার্যক্রমভূক্ত ৭টি জেলা হচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, পটুয়াখালী, নওগাঁ, যশোর, বগুড়া এবং হবিগঞ্জ। ২০১২-১৩ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৬৬,০০,০০০ (ছিষট্টি লক্ষ) টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে নতুন ১৪ জেলাসহ মোট ২১টি জেলায় এ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয় এবং জেলাগুলো হচ্ছে ঢাকা, নারায়নগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইল, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া, কুমিল্লা, পাবনা, নওগাঁ, দিনাজপুর, নীলফামারী, যশোর, কুষ্টিয়া, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী এবং হবিগঞ্জ। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৭,৯৬,৯৮,০০০ (সাত কোটি ছিয়ানববই লক্ষ আটানববই হাজার) টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে পূর্বের ২১ জেলায় এ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ ৯,২২,৯৪,০০০ টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে ৬৪ জেলায় সম্প্রসারণ করা হয়েছে এবং বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ ১৮ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ৬৪ জেলায় বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ ২০,৩০,০০,০০০ (বিশ কোটি ত্রিশ লক্ষ) টাকা।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে দলিত জনগোষ্ঠীর জন্য দেয়া এই বরাদ্দ যদি দেশের ৬৫ লক্ষ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে বণ্টন করা হয়, তাহলে তাদের বাৎসরিক মাথাপিছু বরাদ্দ হয় ৩১.২৩ টাকা মাত্র। আর এই বাৎসরিক বরাদ্দকে যদি দৈনিক হারে বণ্টন করা হয় তাহলে মাথাপিছু দৈনিক বরাদ্দ হয় মাত্র ১.০৪ টাকা। এতে অনগ্রসর শ্রেণির মধ্যে আরও অনগ্রসর হলো দলিত জনগোষ্ঠী। সুতরাং দলিত জনগোষ্ঠীর জন্য এই বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য।
বিগত ২৯ মে, ২০১২ সালে, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ বিভাগ থেকে জারিকৃত পরিপত্রের মাধ্যমে সরকার কর্তৃক পরিচালিত সামাজিক বেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় ভিজিএফ প্রকল্পে উপকারভোগীর ক্ষেত্রে দলিত ও হরিজন জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্তি নিশ্চিতকরণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়। এই বাস্তবায়নের জন্য এ ক্ষেত্রে বাজেটে আরও পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন।

সরকার কর্তৃক দলিত উন্নয়নে যেসব কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে জাতীয় বাজেটে নিরাপত্তা খাতে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ প্রদান অন্যতম প্রধান। সমাজসেবা অধিদপ্তর কর্তৃক দলিত, হরিজন, বেদে উন্নয়ন নীতিমালা গ্রহণ করা হয়েছে এবং বরাদ্দকৃত প্রকল্প প্রায় ৪১ টি জেলায় শিক্ষাবৃত্তি, যুব প্রশিক্ষণ ও বয়স্কভাতা প্রদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২৯ মে, ২০১২ তারিখে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের দলিত জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে একটি নির্দেশনা প্রদান করেন। দলিত শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যথাযথ ভর্তি কোটা এবং হরিজনদের পরিচ্ছন্নতা কর্মীর চাকরিতে ৮০% কোটা বরাদ্দ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ¯ইস্পেশাল এরিয়া ফর ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পাশাপাশি দলিতদের অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।

দলিত জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ে নিজস্ব কর্মসূচি ভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ
দলিত জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ে নিজস্ব কর্মসূচিভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ হয়েছে। যেমন, শহরাঞ্চলের দলিত জনগোষ্ঠীর আবাসন ব্যবস্থা উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ২০০৫ সালে বাংলাদেশ সরকার ঢাকা সিটি করপোরেশনের অধীন ধলপুর, সূত্রাপুর এবং দয়াগঞ্জে সুইপার কলোণী নির্মাণের জন্য ঢাকা সিটি করপোরেশনকে ২০ কোটি ৯৩ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়। দলিত আবাসনের উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কয়েকজন অসাধু ব্যক্তির ব্যাপক দূর্নীতির ফলে ঐ আবাসন প্রকল্পটি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। (সূত্র: দৈনিক সমকাল, ১২ এপ্রিল, ২০১২)।

পরবর্তীতে জাতীয় বাজেটের আবাসন খাতে দলিত, বেদে ও হিজড়া জনগোষ্ঠীর আবাসন ব্যবস্থার উন্নয়নে ২০১১-১২ অর্থবছরে ১০ কোটি টাকা, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১৪ কোটি ৬১ লক্ষ টাকা এবং ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১২ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বরাদ্দ প্রদান করা হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে উল্লেখিত জনগোষ্ঠীর আবাসন খাতে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়। সে অনুযায়ী ইতিমধ্যে ঢাকা শহরের বিভিন্ন কলোনিতে কিছু বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে এবং কিছু ভবনের নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়াও গত ১ অক্টোবর, ২০১৩ তারিখে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় সরকার কনস্ট্রাকশন অব কিলিনার কলোনি অব ঢাকা সিটি করপোরেশন এর প্রকল্পের আওতায় ঢাকা সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য ১ হাজার ১৪৮টি ফ্ল্যাট নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, যার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৯০ কোটি টাকা। বাজেট বরাদ্দ অনুযায়ী ঢাকা শহরের কলোনিগুলোতে বসবাসরত দলিত জনগোষ্ঠীর আবাসন সমস্য সমাধানে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ইতিমধ্যে বেশ কিছু ভবন নির্মাণ ও হস্তান্তর করা হয়েছে। সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ২ অক্টোবর ২০১৩ (একনেক-এর সিদ্ধান্ত)।

২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের বাজেটে দলিত ও ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ বরাদ্দ রেখে দলিত, হরিজন ও বেদে জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের কার্যক্রম সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন করা হয়। দলিত ও হরিজন জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের জন্য মন্ত্রণালয় ভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ রাখা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায়, দলিত ও হরিজন জনগোষ্ঠী তাদের অনগ্রসরতা থেকে মুক্তি পাবে না।

‘দলিত’ জনগোষ্ঠীকে স্বীকৃতি ও বর্ধিত বরাদ্দ জরুরি
সর্বপ্রথম ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে দলিত শব্দটি ব্যবহার করে। সেখানে দলিত উন্নয়নের লক্ষ্যে কিছু কর্মসূচির ঘোষণা দেয়া হয়। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত এই সমাজটি আন্তর্জাতিক পরিসরে দলিত হিসেবে বহু আগে থেকেই স্বীকৃত হলেও আমাদের দেশে ২০০৮ সাল থেকেই মূলত দলিত শব্দটি পরিচিতি লাভ করে। তখন থেকেই দলিত উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা সামাজিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্ব পেতে শুরু করে। এরপর ২০১০-১১ অর্থবছরে সর্বপ্রথম দলিতদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেয়া হয়।

কিন্তু ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে দলিত শব্দটি উল্লেখ না করে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেয়া হয়, যা দলিত-হরিজন-বেদে জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ফলে, দলিত জনগোষ্ঠীর প্রতি আরও বৈষম্যের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কেননা দলিত শব্দটি উল্লেখ না করার কারণে বরাদ্দকৃত বাজেট প্রাপ্তিতে দলিত জনগোষ্ঠী বঞ্চিত হবে। মূলধারার দরিদ্র বা অনগ্রসর জনগোষ্ঠী এখানে অধিক গুরুত্ব পাবে। বরাদ্দকৃত বাজেট সঠিকভাবে বিতরণের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে স্থানীয় সরকারের কাছে দেয়া হবে। কিন্তু অনগ্রসর জনগোষ্ঠী বলতে যেহেতু দলিত, হরিজন, বেদে ছাড়াও আরও অনেক দরিদ্র ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে বুঝানো হয়ে থাকে, কাজেই স্থানীয় সরকার কর্তৃক সেই বাজেট সকল দলিত সম্প্রদায় ছাড়াও অন্যান্য অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকেও দেয়া হবে। একই সাথে দলিতদের যেহেতু নির্দিষ্ট কোনো সরকারি স্বীকৃতি নেই, অর্থাৎ তারা তালিকাভূক্ত নয়, কাজেই মূলধারার দরিদ্র জনগোষ্ঠীকেই দলিত হিসেবে পরিচয় দিয়ে এসব বিশেষ সুবিধা ভোগ করার চেষ্টা চালানোর সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে, দলিতরা বর্তমান বাজেটে পূর্বের তুলনায় অধিক বরাদ্দ পেলেও প্রকৃতপক্ষেই কতখানি সুবিধা ভোগ করতে পারবে সে বিষয়ে যথেষ্ট আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। কাজেই অতিসত্বর সরকারি নীতিমালা এবং বাজেটে ‘দলিত’ শব্দটি বহাল রেখে দলিত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ বরাদ্দ রাখার জন্য সরকারকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
৮. সুপারিশ ও করণীয়:
• সরকারি সকল নীতিমালায় দলিত ও বঞ্চিত সম্প্রদায়কে যথাযথ স্বীকৃতি দিতে হবে;
• দেশে দলিত জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয়ের জন্য আদমশুমারীতে পৃথকভাবে চিহ্নিত করে গননা করতে হবে। যাতে করে এই জনগোষ্ঠীর সার্বিক উন্নয়নে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা যায়;
• সংখ্যানুপাতের ভিত্তিতে উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দ দিতে হবে। দলিত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা দিতে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখতে হবে;
• বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মক্ষম দলিত জনগোষ্ঠীর দক্ষতা বৃদ্ধি ও আয়বৃদ্ধিমূলক কাজে সহায়তার জন্য বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখতে হবে;
• শিক্ষায় সরকারি নিয়োগে দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ কোটা চালু করতে হবে;
• প্রকৃত দলিতরাই যাতে বাজেটের বরাদ্দকৃত সুবিধা পায় সে জন্য সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায় থেকে আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা প্রদান করা এবং একটি মনিটরিং-এর ব্যবস্থা গতে তুলতে হবে;
• বিভিন্ন সরকারি সেবায় উপকারভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় তৃণমূল পর্যায়ে কমিটি গঠন করে সে কমিটিতে স্থানীয় দলিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি রাখতে হবে। এই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাকেও স¤পৃক্ত করা যেতে পারে;
• শহরাঞ্চলে বিভিন্ন দলিত ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য আবাসন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা দাবি করছি, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে যাদের কাজ আছে, কি নাই, এটা বিবেচনায় না নিয়ে সকলকে আবাসন বরাদ্দ দিতে হবে। কারণ দলিতদের সকলের চাকুরীর নিশ্চয়তা নাই এবং অস্পৃশ্যতার কারণে কলোনীর বাইরে তাদের বাড়ি ভাড়া পাওয়া সম্ভব নয়;
• রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের চাকরি নিয়মিতকরণের জন্য বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে; এবং
• পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য নির্ধারিত কলোনির সকল বাসিন্দাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কাজের নিশ্চয়তার জন্য বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখতে হবে।

 

রচনা: ‘বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী অধিকার আন্দোলন’ ও ‘নাগরিক উদ্যোগ’

 

দলিত বাজেট ২০১৭