যুববান্ধব বাজেট

পৃথিবীতে সাতশ ত্রিশ কোটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে একশ আশি কোটি বয়সে তরুন; উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তাদের বেশিরভাগের বসবাস। বাংলদেশের আদমশুমারী (২০১১) অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগ তরুন-তরুনী, যাদের বয়ষ সীমা ১৮ থেকে ৩৫ বছর। বাংলদেশ শ্রমশক্তির জরিপ ২০১৩ অনুযায়ী ২০১৩ সালে ২৩.৪ মিলিয়ন তরুন-তরুনী (বয়স সীমা ১৫ থেকে ২৯) জাতীয় শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ করে, যাদের তাদের অংশগ্রহণ বেড়ে ৬০ শতাংশের কাছাকাছি পৌছাবে এবং এ ধারা ২০৫০ সাল পর্যন্ত চলবে। এটা বাংলদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার ক্ষেত্রে বিশাল সুযোগ তৈরি করবে। এই সুযোগের সদ্ব্যবহারের জন্যদক্ষতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কৌশলগত বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমান ক্ষমতাশীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তরুন-তরুনীদের জন্য বিনিয়োগ বাড়াতে অঙ্গিকার করেছে এবং সেই লক্ষ্যে কাজ করছে।

যুবা, মানুষের জীবনের একটি বিশেষ সময়। এ সময় একজন যুবা শারীরিক ও মানসিক  পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে ধাবিত হয়। তারা অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে দায়িত্ববান মানুষে পরিণত হয়। এই পরিবর্তনকালীন সময়ে তারা ঝুঁকি ও সুরুক্ষাহীনতার মধ্যে পড়ে। সম্পদ ও সুযোগের বৈষম্য, সামাজিক বিচ্ছিতা, দরিদ্র্য, অনিরাপদ যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য, প্রযুক্তিগত বৈষম্য, সুস্থ্য বিনোদনের অভাব এবং পরিবেশগত দুর্যোগ তরুন-তরুনীদেও আরো বেশি সুরুক্ষাহীন ও ঝুঁকিগ্রস্থ করছে। একজন কর্ম-অদক্ষ, মানসিক ও শাররীকভাবে অসুস্থ, এবং বেকার তরুন-তরনী সমাজে সংকট, বিশৃঙ্খলা, সংঘাত ও সহিংসতা সৃষ্টি করে। কারণ সুযোগ সক্ষমতার ঘাটতি তাদেরকে ঝুঁকিগ্রস্থ করে তোলে। বিপরীতে একজন কর্মদক্ষ, সুবল ও  কর্মজীবী তরুন-তরুনী সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নের ধারক ও বাহক হয়ে থাকে। বাজেট তৈরির প্রক্রিয়ায় তরুন-তরুনীদের সম্ভাব্য বিপদাপন্নতা, ঝুঁকি এবং সুযোগ পাওয়ার বিষয়গুলো অবশ্যই জননীতি প্রক্রিয়ায় প্রতিফলিত হওয়া উচিত । বাজেট প্রণয়ন প্রাক্কালে তরুন-তরুনীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং তাদের প্রস্তাবনাগুলো শুনতে হবে।

 

বাংলাদেশের যুব বাজেট:

বর্তমান সরকার যুব উন্নয়নের জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সরকার ইতোমধ্যে জাতীয় যুব উন্নয়ন নীমিালা ২০১৬ (খসড়া) প্রণয়ন করেছে,  যা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সরকার তরুন-তরুনীদের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য  জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন পরিষদ (NSDC) প্রতিষ্ঠা করেছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রনালয়ের বরাদ্দকৃত উন্নয়ন বাজেটের পরিমাণ ২০১৪ সাল থেকে ক্রমশ বৃদ্দি পাচ্ছে।

 

আন্ত:মন্ত্রনালয়ের বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে দেখা যায় ক্রীড়াখাত (জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, বিকেএসপি এবং ক্রীড়া পরিদপ্তর) উন্নয়ন যুব উন্নয়নের তুলনায় বেশি উন্নয়ন বরাদ্দ পেয়ে থাকে। ২০১৪ সাল থেকে বিকেএসপির বাজেট বরাদ্দের পরিমাণ ক্রমহ্রাসমান রয়েছে (সারনি-২) ।

যেহেতু যুব উন্নয়ন একটি ক্রসকাটিং এজেন্ডা তাই সরকার ২২ টি মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে যুব উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ করে থাকে; সেগুলো হচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রনালয়, শিল্প মন্ত্রনালয়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রনালয়, নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রনালয়, ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রনালয়, কৃষি মন্ত্রনালয়, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন এবং সমবায় মন্ত্রনালয়, বেসরকারি বিমান ও পর্যটন মন্ত্রনালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রনালয়।

গত কয়েক বছর যাবত সরকারের জাতীয় উন্নয়ন বাজেটের আকার ক্রমশ বড় হচ্ছে, কিন্তু সেই তুলনায় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রনালয়ের উন্নয়ন বাজেট বৃদ্ধি পায়নি। ২০১৬- ১৭ অর্থ বছরে জাতীয় বাজেটের মাত্র ০.২৬ শতাংশ যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রনালয়ের জন্য  বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

সরণি-৪ অনুযায়ী: ২০১৬- ১৭ অর্থবছরের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রনালয়ের বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার যুবপ্রতি ৫৯.৭৬ টাকা বিনিয়োগ করেছে, যা যুবদের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। এছাড়া মন্ত্রনালয়ের বাজেট বরাদ্দের ৮০ শতাংশই  ছিল অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য।

সরকারের অন্যান্য মন্ত্রনালয়গুলোও যুবদেরকে মানব সম্পদে রুপান্তরের জন্য  বিপুল পরিমাণে বিনিয়োগ করছে। কিন্তু আমাদের কাছে কোন তথ্য নেই  কোন মন্ত্রনালয় কতটুকু অর্থ যুব উন্নয়নে বিনিয়োগ করছে। হয়তো অন্যান্য মন্ত্রনালয়গুলো যুব উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগকৃত অর্থের তথ্য আলাদা করে প্রকাশ করে না অথবা সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই। এই কারণে কোন মন্ত্রনালয় কি পরিমাণ অর্থ যুব উন্নয়নে বিনিয়োগ করছে এটা পরিমাপ করা খুবই কঠিন; একই সাথে যুবদের কাছে কোন মন্ত্রনালয় থেকে কি ধরণের পরিসেবা পেতে পারে সে সম্পর্কে কোন তথ্য না থাকায় তারা সেবা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিয় হয়।

 

যুববান্ধব বাজেটের কতিপয় প্রম্ভাবনা

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রনালয়ের বাজেটে বরাদ্দের পরিমাণ ধীরধীরে বাড়লেও তা যুবদের চাহিদা, পছন্দ ও আকাঙ্খা পূরণে যথেষ্ট নয়। বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ছাড়া অন্য কোন মন্ত্রণালয় যুব উন্নয়নকে বিশেষ বিভাগ হিসেবে বিবেচনায় না নিয়ে তাদের নিয়মিত কাজের মধ্যদিয়ে যুব উন্নয়নে পরোক্ষ ভূমিকা পালন করে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ছাড়া অন্যান্য বিভিন্ন মন্ত্রনালয় যুবকদের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু যুবকদের জন্য তাদের আলাদাভাবে সরাসরি কোন প্রকল্প বা কর্মসূচি নাই। যারা ভোকেশনাল বা কারিগরী শিক্ষা গ্রহণ করছেন তাদের উচ্চশিক্ষা গ্রহনের সুযোগ এখনও অনেক কম। মন্ত্রণালয়গুলোর বেশির ভাগ বরাদ্দ অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করা হয়। কিন্তু প্রশিক্ষণ বা দক্ষতা উন্নয়নে বরাদ্দ এখনও কম।  এ নিরিখে নিম্নবর্ণিত প্রস্তাবনাগুলি তুলে ধরা হল:

১.    সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় কারিগরী ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা যুক্ত করতে হবে;

২.    যুবদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে শিক্ষা পাঠ্যক্রমে যুক্ত করার জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হবে;

৩.    পলিটেকনিক থেকে পাসকৃত শিক্ষার্থীদের জন্য আরো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে;

৪.    কারিগরী ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে বাজেটে বরাদ্দ করতে হবে;

৫.    বাজার মূখী দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে;

৬.    যুববান্ধব পরিবেশ ও তাদের জন্য সুস্থ্য বিনোদনের ব্যবস্থা নিশ্চিতের লক্ষ্যে ন্যাশনাল ক্যারিয়ার কাউন্সিলিং সেন্টার, গণ পাঠাগার, উন্মুক্ত খেলার মাঠ, যুববান্ধব গবেষণা ও আবিস্কার কেন্দ্র এবং ইয়ুথ সেন্টার ফর ক্যারিয়ার লানিং প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে;

৭.    সেচ্ছাসেবক যুব সংগঠনকে কারিগরী ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে হবে;

৮.    নতুন যুব ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে হবে যাতে করে যে কোন দক্ষ যুব উদ্যোক্তার সহজ শর্তে ঋণ পায় এবং সুদের হার ৪ শতাংশের নিচে থাকবে;

৯.    প্রতিটি উপজেলা অথবা ইউনিয়নে যুববান্ধব আইটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা করতে হবে;

১০.    মাদকাসক্ত যুবকদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য একটি বিশেষায়িত কেন্দ্রীয় হাসপাতাল এবং পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

১১.    বৈদেশিক কর্মসংস্থানে ইচ্ছুক তরুণদের জন্য বিভাগীয় পর্যায়ে একটি বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ও ঋণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

 

লেখক: হাবিবুর রহমান ও সিদ্ধার্থ্ গোস্বামী, সংগঠক, তারুণ্যের বাজেট আন্দোলন

 

 

 

 

 

তারুণ্যের বাজেট ২০১৭