জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট

লায়লা তাসমিয়া

 

জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেটের মূল দর্শন একটি দেশের নারীর ক্ষমতায়ন পূর্ণাঙ্গরূপে নিশ্চিত করা। সরকারের আয় ও ব্যয়ের নীতির প্রভাব জেন্ডারের উপর কতটুকু পড়ে তার বিস্তারিত বিশ্লেষন থাকে জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেটে।  এই বাজেট প্রক্রিয়ার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো তা প্রচলিত বাজেট প্রক্রিয়ায় উপেক্ষিত কিছু আর্থ-সামাজিক বিষয়কে আমলে নেয়। যেমন- নারীর অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাজের বন্টন এবং তাদের অমূল্যায়িত কাজ কিভাবে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে অবদান রাখে, কর আদায় ও কর রাজস্বের ব্যয় কিভাবে দরিদ্র নারী ও তার উপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের উপর প্রভাব ফেলে এবং একই পরিবারের মধ্যে সম্পদের বন্টন কিভাবে হয়। ৯০ এর দশকে অন্যান্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়।

উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, জেন্ডার বাজেটিং বা জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট প্রণয়নের অর্থ শুধুমাত্র বাজেটে নারীর জন্য রাখা বরাদ্দ নয় যা সাধারণ অর্থে মনে হয়। বরং সমাজে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমতা আনার লক্ষ্যে নারীর পূর্ণক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার জন্যে বাজেট প্রণয়ন। শুধুমাত্র নারী-পুরুষভেদে নয়, সমাজে এখনো বিভিন্ন পর্যায়ে পিছিয়ে থাকার ক্ষেত্রে নারীর বিভিন্ন অবস্থানভেদে যে অভিজ্ঞতা এবংঘাটতি আছে তা চিহ্নিত করেসঠিকভাবে বাজেট করতে হবে।এর জন্য যেমনদেশের সংবিধান, দেশের আইন ও অন্যান্য জাতীয় নীতিতে করা অঙ্গীকারগুলো মাথায় রেখে জাতীয় বাজেটে রাজস্ব নীতি এবং উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে, তেমনি নারী-পুরুষের নির্বিশেষে সম্ভাবনা এবং ঘাটতিগুলি বিবেচনায় রেখে সীমাবদ্ধসম্পদের থেকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বাজেট সাজাতে হবে।

 

বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে জেন্ডার বাজেট:

বর্তমানে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ও মানব উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশেষত সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে সামনে রয়েছে – ক. বাংলাদেশের সংবিধান, যার ১৯, ২৭, ২৮ ও ২৯ নং অনুচ্ছেদে নারীর সমান অধিকার ও সুযোগের কথা বলা হয়েছে; খ. স্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক সনদ এবং আন্তর্জাতিক লক্ষ্যসমূহ (যেমন-Convention on the Elimination of All forms of Discrimination Against Women ev CEDAW,  টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ইত্যাদি) যা বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে; গ. সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১৫-২০) যার জেন্ডার ভিসন হলো নারী পুরুষের সমান সুযোগ ও অধিকার থাকার এবং সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উন্নতিতে নারীর সমান অবদান রাখার মতো দেশ তৈরি করা; ঘ. জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১, যার ভিসন হলো ২২টি লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যমে সমাজে নারী-পুরুষের সমান সুযোগ প্রাপ্তি এবং সকল মৌলিক অধিকার সমভাবে ভোগ করার মতো অবস্থা তৈরি করা; ঙ. সমান অধিকার ভোগের পরিবেশ তৈরি বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে সার্বিকভাবে কাজ করার পরিপ্রেক্ষিতে অন্যান্য আইন ও নীতিসমূহ (যেমন- পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা নীতিমালা ২০১৩, শিশু আইন ২০১১ ও শিশু নীতি ২০১৩, মানব পাচার প্রতিরোধ আইন ২০১২, হিন্দু বিবাহ রেজিস্ট্রেশন আইন ২০১২ ইত্যাদি)। এই লক্ষ্য, আইন ও নীতিগুলোকে মাথায় রেখে জাতীয় বাজেটের পরিকল্পনা থেকে প্রকাশ পর্যন্ত ৩টি পদ্ধতির মাধ্যমে জেন্ডার বাজেটিং করা হয়:

১.    ২০০৫-৬ অর্থবছর  থেকে বাজেট কাঠামোর ৩নং অংশে মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর আওতায় নারী উন্নয়নমূলক বিশ্লেষন করা হয় যেখানে ১৪টি মানদন্ড ব্যবহার করে দেখা হয় যে প্রতিটি প্রকল্প ও কর্মসূচিতে নারী উন্নয়নে কতটুকু ব্যয় হবে;

২.    অর্থ বিভাগ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত Recurrent, Capital, Gender and Poverty (RCGP)  মডেলে একটি ডাটাবেজের মাধ্যমে দেখা হয় যে উন্নয়ন বাজেটের পাশাপাশি অনুন্নয়ন বাজেটে নারী কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সুফল ভোগীদের অংশানুযায়ী নারী উন্নয়নের জন্য কতটুকু বরাদ্দ আছে;

৩.    প্রতি অর্থবছরে বাজেট প্রণয়নের সময় মন্ত্রণালয় থেকে নারী উন্নয়নের জন্য গৃহীত কৌশল, কার্যক্রম, উক্ত মন্ত্রণালয়ের নারী বিষয়ক কার্যক্রমের অর্জন এবং নারী উন্নয়নে কতটুকু ব্যয় হবে তার বিস্তারিত তথ্য একটি জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন আকারে প্রণয়ন ও মহান জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয়। ধারণাগত জায়গা থেকে পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন যে, এ প্রতিবেদন মূলত জেন্ডার সংবেদনশীলতা ও নারী ক্ষমতায়নের লেন্স থেকে দেখা বাজেটের বিশ্লেষনপত্র।

২০১৬-১৭ এর বাজেট বক্তৃতায় মাননীয় অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য সরকার বেশ কিছু স্থাপনা (যেমন- হোস্টেল, ট্রেনিং সেন্টার), বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান করেছে। নারীর জন্য কর্মোপযোগী পরিবেশ তৈরির জন্যশিশু বিকাশ কেন্দ্র ও শিশু দিবাযতœ কেন্দ্র স্থাপন করেছে।

 

২০১৩-১৪ অর্থবছরথেকে সরকার জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে ৪০টি মন্ত্রনালয়কে অন্তর্ভুক্ত করে এবং ৩ টি গুচ্ছে ভাগ করে প্রতিবেদন তৈরি করে-

১.    নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি কৌশলের অধিনে রয়েছে ৭ টি মন্ত্রণালয়;

২.    উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শ্রমবাজার ও আয়বর্ধক কাজে নারীর অধিকতর অংশগ্রহণ নিশ্চিত কৌশলেরঅধীনে আছে ৯টি মন্ত্রণালয়; এবং

৩.    সরকারি সেবা প্রাপ্তিতে নারীর সুযোগ বৃদ্ধি করার কৌশলের অধিনে রয়েছে ২৪ টি মন্ত্রণালয়।

জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে ৪০টি মন্ত্রনালয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরপর থেকে গত অর্থবছর পর্যন্ত মোট বাজেটের তুলনায় নারী উন্নয়নে বরাদ্দের শতকরা হার কমলেও বর্তমান অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শতকরা হার বেড়েছে।

 

সারণী ১: গত ৪ অর্থবছরে ৪০ টি মন্ত্রনালয়ে মোট বাজেটের তুলনায় নারী উন্নয়নে বরাদ্দের শতকরা হার (%)

 

অর্থবছর মোট বাজেটের তুলনায় নারী উন্নয়নে বরাদ্দের শতকরা হার (%) জিডিপির শতকরা হার (%)
২০১৩-১৪ ২৭.৬৪ ৫.০৬
২০১৪-১৫ ২৭.৭৪ ৪.২৩
২০১৫-১৬ ২৭.১৭ ৪.১৬
২০১৬-১৭ ২৭.২৫ ৪.৭৩

সুত্র: জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন ২০১৬-১৭

 

এ বছরের জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে লক্ষ্য করা যায় যে, গতবছরের প্রস্তাবিত ও সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন বাজেট উভয়ক্ষেত্রে নারীর হিস্যা টাকার অংকে বাড়লেও তার শতকরা হার কমেছে।

সারণী ২: মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে নারীর জন্য বরাদ্দ বাজেট (কোটি টাকায়)

বিবরণ ২০১৬-১৭ (প্রস্তাবিত বাজেট) ২০১৫-১৬ (সংশোধিত বাজেট) ২০১৫-১৬ (প্রস্তাবিত বাজেট)
 মোট বাজেট ৩৪০৬০৫ ২৬৪৫৬৫ ২৯৫১০০
মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দে নারীর হিস্যা ১৬৫৬ ১৩৬৮ ১৩৭৯
উন্নয়ন বাজেটে নারীর হিস্যা ১১৬ ৯৭ ১৩২
অনুন্নয়ন বাজেটে নারীর হিস্যা ১৫৪০ ১২৭১ ১৫২৯

সূত্র: জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন ২০১৬-১৭

 

 

জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেটের বাস্তবতা:

৯০’র দশকে ঊত্থাপিত জেন্ডার বাজেটিং এর মূল উদ্দেশ্য বাজেটের পরিকল্পনা থেকে প্রণয়ন পর্যন্ত জেন্ডার সংবেদনশীলতা নিশ্চিত করার পক্ষে কাজ করা। বাংলাদেশে জেন্ডার বাজেটিং এর শুরু থেকে এখন পর্যন্ত নেয়া পদক্ষেপগুলো অবশ্যই প্রশংসনীয় এবং পূর্বের তুলনায় জাতীয় বাজেটে জেন্ডার ইস্যুকে নিয়ে ভাবার অভিপ্রায় তৈরি করেছে। কিন্তু এই বাজেটিং করতে গিয়ে নারীর ক্ষমতায়নের ধারণাগত কিছু বিষয়ের বাস্তবায়ন সময়ের সাথে অপরিলক্ষিত। নারীর ক্ষমতায়নকে বুঝতে হলে ২ ধরণের মৌলিক জেন্ডার চাহিদাকে বুঝতে হবে: একটি হলো প্র্যাকটিকাল জেন্ডার চাহিদা, আরেকটি হলো স্ট্র্যাটেজিক জেন্ডার চাহিদা। প্র্যাকটিকাল জেন্ডার চাহিদা হলো সেসব চাহিদা যা তাৎক্ষণিকভাবে পূরণ করা যাবে ও স্বল্পমেয়াদী সমাধান দিবে যার জন্য সামাজিকভাবে পরিলক্ষিত নারীর জেন্ডার রোলকে পুরোপুরি পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই। যেমন- পরিবারে নারীই পানির সরবরাহকারী; সেখানে বাড়ির পাশে টিউবওয়েল স্থাপন করা যেন নারী স্বল্প সময়ে তার হাতের কাছে পানির ব্যাবস্থা পায়। অন্যদিকে স্ট্র্যাটেজিক জেন্ডার চাহিদা হলো সেসব চাহিদা যা তাৎক্ষণিকভাবে পূরণযোগ্য নয়। এই চাহিদা পূরনে এমন সমাধান দিতে হবে যার জন্য নারীর সামাজিক জেন্ডার রোলকে আঘাত করে তা এক সময়ে পরিবর্তন করাবে। যেমন- ঘর থেকে পানির উৎস পর্যন্ত নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা, নারীর এই রোলকে বন্টন করা ইত্যাদি।

বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট প্রণয়ন করার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র বাজেটের অপ্রতুলতা নয়, বরং নিন্মলিখিত চ্যালেঞ্জ লক্ষণীয়:

১.    শুধুমাত্র সংখ্যাতাত্তিক বিশ্লেষন: জাতীয় বাজেটে জেন্ডার বাজেটিং করনের জন্য যে ৩টি বিশ্লেষন পদ্ধতি রয়েছে (মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর আওতায় নারী উন্নয়নমূলক বিশ্লেষন, Recurrent, Capital, Gender and Poverty (RCGP) মডেল এবং জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন) তার সবগুলোই কেবল সংখ্যাতাত্তিক বিশ্লেষন। এ ধরণের বিশ্লেষনে নারীর প্র্যাকটিকাল জেন্ডার চাহিদাগুলোকে চিহ্নিত করা যায় না। এ সম্পর্কিত একটি মতামত বিশ্লেষনে উল্লেখ আছে …. (বাজেটে) শুধুমাত্র লিঙ্গভেদে সম্পদের কতটুকু বরাদ্দ আছে তার উল্লেখ নারীর ক্ষমতায়নের জন্য মূল উপকরণগুলোকে নির্ধারণ করতে পারবে না। এর জন্য প্রয়োজন সুশাসনের মাধ্যমে নীতি নির্ধারণগুলো বাস্তবায়নে মনোযোগী হওয়া।

২.    অনেক ক্ষেত্রেই সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ও অগ্রগতির বিষয়ে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ নেই: প্রতি বছরই বাজেটিং এর জন্য কিছু সুপারিশকৃত কার্যক্রম থাকে। সেই সুপারিশকৃত কার্যক্রম সাপেক্ষে জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে যে অগ্রগতির কথা উল্লেখ করা হয়, সেখানে অনেকক্ষেত্রেই সুনির্দিষ্ট কী কী কর্মসূচি নেয়া হয়েছে বা তার অগ্রগতিই কতটুক সে বিষয়ে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ নেই। উদাহরণস্বরূপ, এ বছরের জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত অধ্যায়ে গত বছরের কিছু সুপারিশ হিসেবে পরিবারে নারী শিক্ষার্থীদের বৈষম্যের শিকার না হওয়ার জন্য কর্মসূচি নেয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই স্ট্র্যাটেজিক জেন্ডার চাহিদা পূরণের জন্য দরকারি কোন মধ্যমমেয়াদী বা দীর্ঘমেয়াদী কোন পরিকল্পনা বা কর্মসূচির কোন আভাস নেই।

৩.    জেন্ডার বাজেটিং এ মনিটরিং এর অভাব: প্রতিবছর জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট প্রণয়নে কোন সুনির্দিষ্ট মনিটরিং করা হয় না। ফলে নারীর ক্ষমতায়নের অবস্থানগত পরিবর্তন বুঝা যায় না।

৪.    জেন্ডার বাজেটিং প্রক্রিয়ায় নারীর পূর্ণ ও সক্রিয় অংশগ্রহন:  জেন্ডার বাজেটিং প্রক্রিয়ায় আসলেই কি নারীর সক্রিয় অংশগ্রহন হচ্ছে? জেলা উপজেলায় যে ওয়ার্ড সভাগুলো হয় সেখানে কি নারীর চাহিদা পূর্ণ ও সক্রিয়ভাবে প্রস্তাবিত হয় এবং গ্রাহ্য হয়? এই বিষয়ে মনিটরিং কী উপায়ে করা যাবে? নারীর পূর্ণ রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নেই বলে নির্বাচিত নারী সদস্যরা নামেমাত্রই এবং শুধু সংখ্যাতেই স্থানীয় সরকারের অংশ হয়ে আছে।  জেন্ডার বাজেটিং প্রক্রিয়ায় এ বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হবে।

জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট প্রণয়নে সুপারিশসমূহ:

৯০’র দশকে কিছু কিছু দেশে প্রথম প্রণীত জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট পুরুষের তুলনায় নারীর অংশগ্রহণকেই লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনেনারীর সার্বিক ক্ষমতায়নজেন্ডার সংবেদনশীল বাজেটের লক্ষ্য হিসেবে পরিগণিত হয়। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে সুপারিশগুলো নি¤œরুপ:

১.    সংখ্যাতাত্তিকের পাশাপাশি গুণগত বিশ্লেষণ: জাতীয় বাজেটে জেন্ডার বাজেটিং করনের জন্য যে ৩টি বিশ্লেষণ পদ্ধতি রয়েছে তার সংখ্যাতাত্তিক বিশ্লেষনের পাশাপাশি গুণগত বিশ্লেষন করার জন্য পরিমাপক নির্ধারণ করা উচিত। বিশেষতজেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে, সংখ্যাতাত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বরাদ্দ দেখানোর পাশাপাশি সেই বরাদ্দকৃত বাজেট আসলে নারীর কোন স্ট্র্যাটেজিক জেন্ডার চাহিদা পূরণ করছে এবং তার অগ্রগতি কতটুকু হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ থাকতে হবে।

২.    বিভিন্ন মেয়াদীসুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ও অগ্রগতির বিষয়ে তথ্য প্রদান: যেহেতু জেন্ডার বাজেটিং এর দর্শন

নারীর ক্ষমতায়ন পূর্ণাঙ্গ রূপে নিশ্চিত করা, তাই এর জন্য প্রয়োজন সাপেক্ষে স্বল্প, মধ্যম এবং দীর্ঘমেয়াদি সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি, পরিকল্পনা ও তার অগ্রগতির বিষয় বাজেটে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করতে হবে।

৩.    জেন্ডার বাজেট মনিটরিং ও অডিটিং করা: জেন্ডার বাজেটিং এ প্রতি কর্মসূচির জন্য মনিটরিং এবং বড় প্রজেক্টের জন্য অডিটিং এর ব্যবস্থা এবং তার অগ্রগতির বিষয় বাজেটিং প্রক্রিয়ায় উল্লেখ থাকতে হবে।

৪.    নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণে জেন্ডার বাজেটিং: নারীর পূর্ণ রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে স্থানীয় সরকার পর্যায় থেকেই। জেন্ডার বাজেটিং প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ শুধু কাগজে-কলমে ও সংখ্যায় নয়, বরং সক্রিয়ভাবে নিশ্চিত করতে হবে।

৫.    নারীর প্রতি নীতিমালার আলোকে অগ্রগতি দেখানো: জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট প্রণয়নে যে কয়টি নীতিমালা সরকারের কাছে আছে তার প্রতিটির সাপেক্ষে কী কী অগ্রগতি প্রতি বছর হচ্ছে তা বাজেটে দেখাতে হবে।

 

এছাড়াও যে বিষয়গুলো বাজেট প্রণয়ন করার ক্ষেত্রে বিবেচনা করতে হবে-

১.    সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে হবে। যেমন বাজেট প্রণয়ন করার ক্ষেত্রে দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীরসঠিক সংজ্ঞায়ন এবং নারীর অবস্থানভেদে যে অভিজ্ঞতা ও তাদের মূলধারায় আনতে না পারার যেঘাটতি আছে তা বিবেচনায় আনতে হবে;

২.    যৌনকর্মী, হিজড়া, রুপান্তরকামীদের মতো সমাজের অবহেলিতদের মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসতে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা অনুযায়ী বাজেট বরাদ্দের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা থাকতে হবে।

৩.    সরকারি পরিসংখ্যানে নারীর অমূল্যায়িত শ্রমকে অন্তর্ভুক্তি করার লক্ষ্যে বিআইডিএস, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ইত্যাদি সংগঠনে সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে এবং এ জন্য বাজেটের বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

জেন্ডার বাজেট ২০১৭