গত ১৩ জুন জাতীয় সংসদে আগামী ২০১৯-২০ অর্থ বছরের জন্য ৫,২৩,১৯০ কোটি টাকার বাজেট পেশ করা হয়েছে।বাজেটে ৩,১০,২৬২ কোটি টাকার পরিচালন ব্যয় ও ২,১১,৬৮৩ কোটি টাকার উন্নয়ন ব্যয়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।বাজেটে মোট ঘাটতি দেখানো হয়েছে ১,৪১,২১২ কোটি টাকা।

প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে নতুন করে ‘মূল্যায়ন’এর তেমন কিছু নেই। কারণ এটা বর্তমান সরকারের উন্নয়ন দর্শন, নীতি ও কর্মসূচির ধারাবাহিকতা রক্ষা করে প্রণীত হয়েছে। মূলত: ‘প্রবৃদ্ধি নির্ভর’ উন্নয়ন মডেলকে সামনে রেখে গত দশ বছর ধরে যে ধরণের বাজেট প্রণীত হচ্ছে- এটা তারই ধারাবাহিকতা। প্রবৃদ্ধিনির্ভর উন্নয়ন মডেলে ‘সমতা-ন্যয্যতা’র প্রশ্ন উপেক্ষিত থাকে যদি উপযুক্ত নীতি-কর্মসূচির প্রবর্তন ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার না করা হয়। বিগতগত ৫ বছর আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটছে দ্রুতলয়ে কিন্তু উপযুক্ত নীতি-কর্মসূচি-সংস্কারের অনুপস্থিতি দু’টি বড় ধরণের সংকটের জন্ম দিয়েছে: ১. ক্রমবর্ধমান আয় ও সম্পদের বৈষম্য ও ২. বর্ধিত গুনগত মানসম্পন্ন কর্মসংস্থানের অনুপস্থিতি।

প্রবৃদ্ধি নির্ভর উন্নয়ন দর্শন বা মডেলে নানা সীমাবদ্ধতা আছে। আমাদের দেশে এই দর্শনজাত নীতি-কর্মসূচির প্রথম ‘বলি’ হলো- প্রাণ-প্রকৃতি। বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য বিপুল উদযোগে বাছ-বিচারহীনভাবে যে ভৌত অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে তাতে ‘প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ’ মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়ছে। এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। অন্যদিকে মডেলটি দাড়িয়ে আছে এই যুক্তির ওপর যে, বিপুল বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি যদি নিশ্চিত করা যায় তাহলে আপনা-আপনিই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, মানুষ উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে পারবে, যা সাধারণভাবে ‘উন্নয়নের চুঁইয়ে পড়া’ ত্বত্ত্ব হিসেবে পরিচিত। আমরা বিগত কয়েক দশক ধরে এ যুক্তিই শুনে আসছি। কিন্তু এ যুক্তির সাথে বাস্তবতার বিস্তর ফারাক রয়েছে।

এবারের বাজেটে এই বাস্তবতার কোন ‘স্বীকৃতি’ নেই। যদি থাকতো তাহলে নীতি কর্মসূচি ও বাজেট বরাদ্দের প্রবণতায় তার প্রতিফলন দেখা যেত।

মূল ‘চ্যালেঞ্জ’গুলো উপেক্ষিত

আমরা মনে করি, এবারের বাজেটে দু’টি বিশেষ দিকে নজর দেবার দরকার ছিল। কারণ দৃশ্যত: বাংলাদেশের সমাজ-অর্থনীতির সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ দু’টি: ১. ক্রমবর্ধমান আয় ও সম্পদের বৈষম্য এবং ২. বর্ধিত ও গুনগত মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান।

প্রস্তাবিত বাজেটে আয় ও ব্যয় বরাদ্দের ধারা পর্যবেক্ষণ করলে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।। তাছাড়া সংস্কার ও নীতিকাঠামোগত প্রস্তাবগুলির দিকে নজর দিলেও এটা ধরা পড়ে।

‘বৈষম্য’ কমানোর দিকে নজর দেয়া হয়নি

বাংলাদেশে আয় ও সম্পদের বৈষম্য বাড়ছে। সরকারি ও অন্যান্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা প্রতিবেদন থেকে এটা স্পষ্ট। বাংলাদেশে এখন ‘অতি ধনী’ বৃদ্ধির হার বিশ্বে সর্বোচ্চ। ‘ধনী’ বৃদ্ধির হারের দিক দিয়ে দ্বিতীয়। সরকারি তথ্য মতে, সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ ৫% পরিবারের আয়ের ব্যবধান এখন ১২১ %। ফলে একথা স্বীকৃত যে, প্রবৃদ্ধির সুফল সমভাবে বন্টিত হচ্ছে না; খোদ প্রবৃদ্ধি প্রক্রিয়া ধনীকে আরো ধনবান করছে। আয়-সম্পদের বৈষম্য এক পর্যায়ে যে শুধু প্রবৃদ্ধির হারকেই কমিয়ে দেয় তা নয়; সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতাও তৈরি করে। রাজনৈতিক-অর্থনীতি’র দৃষ্টিতে এটা একটা ‘আত্মঘাতি’ প্রক্রিয়া। আমাদের বিগত কয়েক বছরের বাজেট এই ‘আত্মঘাতি’ প্রক্রিয়াটিকেই আরো বেশি মজবুত করে চলেছে।

বৈষম্যকে ‘এ্যাটাক’ করার প্রথাগত পথ দু’টো: সম্পদবানদের কাছে থেকে বর্ধিতহ হারে কর সংগ্রহ এবং করের টাকা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবন মান উন্নয়ন ও অর্থনীতির কৌশলগত সেক্টরগুলিতে বিনিয়োগ। আবার এই সেক্টরভিত্তিক (যেমন ভৌত অবকাঠামো-রাস্তা, ব্রীজ, বিদ্যুৎ ইত্যাদি) বিনিয়োগের সময় প্রকৃতি-পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবকে বিবেচনায় রাখা।

এবারের বাজেটে বিদ্য্যমান কর ব্যবস্থায় এমন কোন পরিবর্তন আনা হয়নি যার ফলে সম্পদবানদের কাছ থেকে আরো বেশি কর সংগ্রহ করা যায়। বলা যায় কর ব্যবস্থা আগে যা ছিল মোটামুটি সেটাই আছে, এখানে মৌলিক কাঠামোগত কোন পরিবর্তন বা সংস্কারের কোন প্রস্তাবও নেই। যে কারণে সরকারকে নির্ভর করতে হচ্ছে পরোক্ষ কর বা আরো বিশেষ ভাবে বললে ‘ভ্যাট’এর ওপর। প্রস্তাবিত বাজেটে ভ্যাটসহ অন্যান্য পরোক্ষ করের পরিমাণ মোট করের ৬৭ শতাংশ। যদিও অতীত অভিজ্ঞতা বলে, বছর শেষে এর চেয়ে বেশি পরোক্ষ কর আদায় করতে হবে। এই ধারা মোটামুটি গত ১০ বছর ধরেই অব্যাহত আছে। অর্থাৎ সম্পদবানদের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ কর আদায় করছে না বলেই পরোক্ষ  কর বাড়াতে হচ্ছে যার দায় মূলত দরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের। এটা একটি বৈষম্য বৃদ্ধিকারী প্রক্রিয়া। প্রস্তাবিত বাজেটে এটাকেই বহাল রাখা হয়েছে। অন্য দিকে কালো টাকা সাদা করা, লোন খেলাপীদের আইনী ও আর্থিক সুবিধা দেয়া, ‘প্রণোদনা’র নামে পোষাক খাতের মালিকদের জন্য অর্থ বরাদ্দ রাখা ইত্যাদি বিদ্যমান বৈষম্যকেই টিকিয়ে রাখার বন্দোবস্ত। এই সব বন্দোবস্ত আগেও ছিল, এটাকেই ধীরে ধীরে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে’ রূপ দেয়া হচ্ছে।

কালা টাকা প্রসঙ্গে বলা যায় যে, দেশে বিদ্যমান কালো টাকার টাকার সবচেয়ে বড় অংশটাই হলো ঘুষ-দুর্নীতি, জোরজবরদস্তি, দখল- এসবের ভেতর দিয়ে তৈরি। কারো কারো মতে এটা হলো ‘চোরাই অর্থনীতি’। এটাই আমাদের অর্থনীতিতে সবচেয়ে ‘দাপুটে’ অংশ যা আমাদের মোট জিডিপি’র ৬০-৭০ শতাংশ প্রায়। বাজেটে এটাকে যখন সাদা করার প্রস্তাব করা হয় তখন কার্যত: সম্পদের বৈষম্যকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নেয়া হয়। একই সাথে সমাজে ‘অনৈতিকতা’কে প্রাকারন্তরে আইনসিদ্ধ করা করা হয়। আগের মতো এবারের বাজেটেও এই কাজটি করা হয়েছে। এমনকি ব্যবসায়ী সমাজের কোন কোন অংশ এই চোরাই অর্থ পাবার জন্য সরকারের কাছে আবেদন-নিবেদনও করছে।

চোরাই অর্থনীতি বন্ধ করে বৈষম্যের রেষকে কিছুটা টেনে ধারার কোন সুস্পষ্ট রূপরেখা এই বাজেটে নেই।

বাজেটে সম্পদ বন্টনের ধারা থেকেও এটা স্পষ্ট যে, এর ফলে দারিদ্র-বৈষম্যকে কার‌্যকরভাবে ‘এ্যাটাক’ করা যাবে না। সমাজের দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য সরাসরিভাবে কতো বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে? ‘সেফটি নেট কর্মসূচি’তে বরাদ্দ থেকে সে সম্পর্কে সামান্য কিছু আন্দাজ করা যায়। এবারের বাজেটে ১৩২ ধরণের বিভিন্ন প্রকল্প/কর্মসূচি রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ৩টি বিশেষ কর্মসূচিতে ( সরকারি কর্মচারি-কর্মকর্তাদের জন্য পেনশন ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ২ ধরণের সম্মানি ভাতা) চলে যাবে মোট বরাদ্দের ৩৬ শতাংশ। মোট বারদ্দ ৭৪, ৩৬৭ কোটি টাকার মধ্যে মাত্র ৪৭, ৪৯২ কোটিা থাকবে দারিদ্র ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে যা মোট বাজেটের মাত্র ৯ শতাংশ। যদিও এই সেফটি নেট কর্মসূচিতে যতো ধরণের ছোট বড় প্রকল্প রয়েছে, তার সবগুলি আদৌ দরিদ্র মানুষের জন্য কিনা- তা নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন রয়েছে। ফলে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য যৎসামান্য ‘ডাইরেক্ট ট্রান্সফার’ বা সামান্য ‘ইডাইরেক্ট সহযোগিতা’- দারিদ্র্য-বৈষম্য কমাতে আদৌ কোন ভূমিকা পারবে কিনা তা প্রশ্ন সাপেক্ষ।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, শিল্প শ্রমিক, বিশেষ করে পোশাক খাতের শ্রমিকদের জন্য রেশন, আবাসন, স্বাস্থ্য সেবার জন্য কোন বিশেষ বরাদ্দ বা কর্মসূচি নেই।

গত কয়েক বছর ধরে, ভৌত অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে।এ খাতে আগামি অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ মোট বাজেটের প্রায় ১২.২ শতাংশ। বড় বড় মেগা প্রকল্প আছে এখানে। বলা হয়ে থাকে এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে, প্রবৃদ্ধি বাড়বে এবং দারিদ্র্য কমবে। কিন্তু মনে রাখা দরকার যে কোন অবকাঠামোগত উন্নয়ন বৈষম্যকেও খানিকটা উস্কে দেয়। কারণ এসব প্রকল্পের সুফল বাস্তব কারণেই সকলে সমান ভাবে ভোগ করতে পারে না। যেমন বড় রাস্তা তৈরি হলে রাস্তার পাশে যার জমি আছে তারই জমির দাম বেড়ে যায়, ঐ জমির মালিকের সম্পদের মূল্যের স্ফীতি ঘটে। একজন ভূমিহীনও হয়তো সেই রাস্তায় রিকসা-ভ্যান চালিয়ে তার ইনকাম আগের চেয়ে কিছুটা বাড়াতে পারে- তবে দুজনের আয়-সম্পদের বৈষম্য বহুগুনে বেড়ে যায়। ফলে বিদ্যমান মালিকানা ব্যবস্থায় এসব বড় প্রকল্পের ‘ইমপ্যাক্ট’  বৈষম্য নিরসনে খুব একটা সহায়ক হয় না।

ফলে এটা স্পষ্ট যে, সরকারি আয় ও ব্যয়ের ধরণের দিক দিয়ে বিবেচনা করলে এই বাজেট বৈষম্য নিরসনকারী নয়, বরং কোন কোন ক্ষেত্রে বৈষম্য বর্ধনকারি।

কর্মসংস্থানবিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই

বর্ধিত হারে গুনগত মান সম্পন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম পূর্বশর্ত হলো ৩টি: ১. বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ২. সামাজিক অবকাঠামো বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বরাদ্দ বৃদ্ধি ও ব্যয়ের গুনগত মান নিশ্চিত করা এবং ৩. ভৌত অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ।

উল্লেখ্য যে, এই শেষোক্ত খাতে প্রতি বছর সরকারি বিনিয়োগ লক্ষণীয় মাত্রায় বাড়ছে; যা এবারের মোট বাজেটের ১২.২ শতাংশ। বড় বড় মেগা প্রকল্পগুলি এই খাতের অন্তর্ভূক্ত। কিন্তু এসব প্রকল্পগুলিতে দুর্নীতি, প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কোন আলোচনা এবারের বাজেট বক্তৃতায় নেই।

আমাদের বিদ্যমান অর্থনীতি ব্যক্তিখাত নির্ভর। আমাদের মোট কর্মসংস্থানের মাত্র ৩.৮ শতাংশ সরকারি খাতের।বাকি ৯৬.২ শতাংশই কোন না কোনভাবে ব্যক্তিখাতের। ফলে ব্যক্তি খাত বা বেসরকারি খাতে বিনিয়োগই কর্মসংস্থান সৃষ্টির একমাত্র পথ। সরকারি বিনিয়োগ সব সময়ই ‘কৌশলগত’। এটা সরাসরি কর্মসংস্থানে তেমন একটা ভূমিকা না রাখলেও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে উৎসাহ যোগায়। অথচ বিগত ৫ বছর ধরে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ জিডিপি’র ২২-২৩ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে।গত অর্থ বছরে এই টার্গেট ধরা হয়েছিল ২৫.১ শতাংশ।অর্জিত হয়নি।এবার টার্গেট কমিয়ে ২৪.১ শতাংশে আনা হয়েছে। এটাও অর্জিত হবে কিনা সন্দেহ।

ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগের এই স্থিতবস্থার ফলে কর্মসংস্থানের ওপরে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।সরকারি হিসাব মতে, দেশে প্রতিবছর ২০ লক্ষ লোক শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। সরকারি তথ্য-উপাত্ত থেকে এটা পরিস্কার বুঝা যায় না যে, আসলে দেশের ভেতরে কতো মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। তাছাড়া যে ধরণের কর্মসংস্থান ঘটছে তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।সর্বশেষ সরকারি হিসাব মতে, দেশের ৮৫.১ শতাংশ কর্মসংস্থান ঘটছে অনানুষ্ঠানিক খাতে যেখানে বেতন-ভাতা, কর্মঘন্টা, কাজের নিশ্চয়তা, উৎপাদনশীলতা ইত্যাদি টেকসই কর্মসংস্থানের নির্দেশক নয়।ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প হলো আমাদের অর্থনীতির ‘ব্যাকবোন’।মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৭০ শতাংশই এ খাতে। কর্মসংস্থানের গুনগত মান বাড়ানোর জন্য এই সেক্টরে প্রচুর সাপোর্ট দরকার। এদের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তাও দরকার।

বাজেটে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ৩ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। এটা কথার কথা।কোন খাতে কোন সময় কতো কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে তার কোন নির্দেশনা এখানে দেয়া হয় নাই।

জাতীয় বাজেটে কর্মসংস্থানের একটি পূর্ণরূপরেখা থাকা উচিত। কোন খাতে, কী ধরণের এবং কতো কর্মসংস্থান হতে পারে- তার একটি চিত্র তুলে ধরা উচিত ছিল।

কর্মসংস্থানের গুনগতমান বৃদ্ধির অন্যতম উপাদান হলো শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বর্ধিত বিনিয়োগ ও ব্যয়ের গুনগত মান নিশ্চিত করা।এ দু’টি খাতের সমস্যা- সংকট ও বিনিয়োগের অপ্রতুলতা নিয়ে কয়েক দশক ধরে বিস্তর আলাপ আলোচনা চলছে। কিন্তু সরকার সেসবের প্রতি দৃষ্টি দেয়নি। এবারো সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে।শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বারাদ্দ যথাক্রমে জিডিপি’র ২.১ ও ০.৯ শতাংশ। বিষ্ময়কর হলো, আমাদের স্বাস্থ্য খাত- যেখানে সরকারি ব্যয় আজ পর‌্যন্ত জিডিপি’র এক শতাংশও অতিক্রম করেনি।এই বিচারে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত হলো সবচেয়ে অবহেলিত।চিকিৎসা ব্যয়ের ৬৭ শতাংশই মানুষের নিজের পকেট থেকে দিতে হয়।চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধির সাথে দারিদ্র্য বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। এর সাথে বৈষম্য বৃদ্ধির সম্পর্কও নিবিড়। শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্রের সাথেও সকলে পরিচিত। এ খাতে বরাদ্দ বেশি দেখানো হলেও তা এখনো আন্তর্জাতিক মানদন্ড ছুঁতে পারেনি। তাছাড়া শিক্ষার গুনগত মান অত্যন্ত নীচুতে অবস্থান করছে। ফলে গণ পরিষেবা খাতগুলিতে বর্ধিত ব্যয় বরাদ্দ ও সেবার গুনগত মান নিশ্চিত করার বিষয়টি এবারের বাজেটে গুরুত্ব সহকারে আলোচিত হওয়া ছিল কিন্তু তা হয়নি।

বাংলাদেশে যে কোন সেক্টরে কর্মরত মানুষের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- ‘ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা’। শ্রমজীবী মানুষের প্রায় ৯৬ শতাংশই বৃদ্ধ বয়সে এরা সহায়-সম্বলহীন। ফলে এদের জন্য পেনশন ব্যবস্থার প্রবর্তন করা দরকার।‘সার্বজনীনন পেনশন স্কীম’ নিয়ে কয়েক বছর কথা হচ্ছে। এবারো বলা হয়েছে। কিন্তু দায়সারা গোছের। কোন সুনির্দিষ্ট রূপরেখা হাজির করা হয়নি।

সুতরাং সামগ্রিক বিবেচনায় বলা যায়, এই বাজেটে কর্মসংস্থান বিষয়ে তেমন কোন দিক নির্দেশনা হাজির করা হয়নি।

বাজেটের কাঠামোগত সংস্কার ও স্থানীয় সরকার প্রস্ঙ্গ: বাজেটে এ বিষয়ে কোন কথা নেই

আমাদের জাতীয় বাজেট ও পরিকল্পনা প্রণয়ন প্রক্রিয়াটি চুড়ান্তভাবে ‘জন অংশগ্রহণহীন’।এটা অতিকেন্দ্রীভূত। সাংবিধানিকভাবে জাতীয় বাজেট অনুমোদনের দায়িত্ব সংসদসদস্যগণের হলেও তাঁরা নানা ধরণের বিধিবিধানের বেড়াজালে আবদ্ধ। বাজেট আলোচনার সময়ও অত্যন্ত সীমিত। তাছাড়া অনেক সদস্য এ আলোচনায় তেমন আগ্রহ দেখান না। এসব কারণে বাজেট অনুমোদন প্রক্রিয়ার গুনগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলি কোনভাবেই বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত নয়। প্রচলিত ব্যবস্থায় বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া মন্ত্রণালয়/বিভাগ নির্ভর। এই অতিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার কারণেই বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার বিকেন্দ্রীকরণের কোন বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে বাজেট ও পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলিকে কার্যকরভাবে যুক্ত করা দরকার। এসব প্রতিষ্ঠানগুলিকে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও আর্থিকভাবে ক্ষমতায়িত করা প্রয়োজন। জন-অংশগ্রহণ প্রক্রিয়ার বুনিয়াদি প্রতিষ্ঠানিক ক্ষেত্র হবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান।

বাজেটে এই কাঠামোগত প্রক্রিয়া সংস্কারের বিষয়টি আলোচিত হয়নি। এমন কি বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে‘জেলা বাজেট’ প্রণয়ন ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্টানগুলিকে আর্থিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হলেও প্রস্তাবিত বাজেটে এ বিষয়ে কোন কথা বলা হয়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত জানুয়ারি মাসে উপজেলাভিত্তিক যে উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরির যে তাগিদ দিয়েছেন তারও কোন প্রতিপলন নেই এ বজেটে।অথচ আমরা জানি যে, পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাজেট বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার সাথে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলির সম্পৃক্ততাই গণতন্ত্রায়নের পথকে সুগম করতে পারে।

আমাদের মুল বক্তব্য

এ বাজেটে অর্থনীতি ও সমাজে বিদ্যমান সংকট ও চ্যালেঞ্জগুলো উপেক্ষিত রয়ে গেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কোন পথ নির্দেশ নেই।এবারের বাজেট একটি অতি সাধারণ মানের একটা ‘রুটিন ওয়ার্ক’ এর মতো হয়েছে। এই অর্থে এটা দায়সারা গোছের। প্রথাবদ্ধ এই অর্থে যে, জাতীয় বাজেট তৈরির কাঠামো ও প্রক্রিয়াতে কোন পরিবর্তন ঘটে নাই বা পরিবর্তনের কোন প্রত্যাশা ও প্রতিশ্রতিও ব্যক্ত করা হয় নাই। এটা সেই পূরাতন আমলাতান্ত্রিক, মন্ত্রণালয় ও বিভাগভিত্তিক, অর্থমন্ত্রণালয় নির্দেশিত ও জন-অংশগ্রহণহীন পদ্ধতিতে প্রণীত হয়েছে।

গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া (২০১৯-২০): প্রস্তাবিত বাজেট ‘দায়সারা গোছের’ এবং ‘প্রথাবদ্ধ’