জেলা বাজেট: একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ

ভূমিকা:
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের ৮৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতি বছর সরকারের আয় ব্যয় সম্বলিত একটি বিবৃতি যা বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি নামে অভিহিত, যা জাতীয় সংসদে পেশ করা হয় সাধারণভাবে তাকে বাজেট বলা হয়। বাজেটের কেতাবি এই সংজ্ঞা ছাড়া আমরা সাধারণত বাজেট বলতে আয় ও ব্যয়ের হিসাব বুঝে থাকি। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে প্রতি বছর বাজেট প্রণয়ন হয়ে আসছে। এখনো পর্যন্ত এ বাজেটের চরিত্র কেন্দ্রীয়। ২০০৯-১০ অর্থবছরে জেলাবাজেটের ধারণা সংসদে আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করা হয়।

জেলা বাজেটের সূচনা
সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন ২০০৯-কে ভিত্তি করে অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে অধিকতর সমতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং এর মাধ্যমে আঞ্চলিক সমতা নিশ্চিত করার জন্য ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার প্রথম টাঙ্গাইল জেলায় জেলাভিত্তিক বাজেট বরাদ্দের চিত্র উপস্থাপন করে। এই জেলাভিত্তিক বাজেট প্রণয়নের মধ্য দিয়ে জাতীয় বাজেটের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল বা জেলা কী পরিমান অর্থ বরাদ্দ পাচ্ছে তা তুলে ধরা হয়। ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে সরকার টাঙ্গাইলসহ আরো ৬টি বিভাগীয় সদর জেলার জেলাভিত্তিক বাজেট বরাদ্দের চিত্র উপস্থাপন করে।

‘জেলা বাজেট’ আর ‘জেলাভিত্তিক বাজেট’ শব্দ দুটির মধ্যেই এদের স্বরুপ নিহিত। জেলা বাজেট এর ধারণার মধ্যে যেসকল বিষয় ও প্রক্রিয়া থাকে তা এই জেলাভিত্তিক বাজেটের মধ্যে তা নেই। তাই জেলাভিত্তিক বাজেট মূলতঃ ‘জেলা ভিত্তিক বাজেট বরাদ্দের হিসাব’-এ পরিণত হয়েছে।

কী প্রক্রিয়ায় এই বাজেট প্রণীত হচ্ছে
এই জেলাভিত্তিক বাজেট প্রক্রিয়ায় কোন জেলায় অবস্থিত সরকারি দপ্তর, সংস্থা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য জাতীয় বাজেট হতে কী পরিমান অর্থ বরাদ্দ করা হবে তা দেখানো হয়েছে।

এর ফলে কী লাভ হচ্ছে
এর ফলে জেলার একজন নাগরিক সহজেই বুঝতে পারবেন যে তার জেলায় কোন সরকারি দপ্তরের জন্য বা কোন খাতের জন্য কী পরিমান বরাদ্দ আছে।

সাত জেলার বাজেট বরাদ্দ
২০১৪-১৫ অর্থ বছরের জেলাভিত্তিক বাজেট বরাদ্দের চিত্র হতে দেখা যাচ্ছে যে, ৭টি জেলার মধ্যে খুলনা জেলায় মাথাপিছু বরাদ্দের পরিমান সবচেয়ে বেশি (ছক ১)। খুলনা জেলার জনসংখ্যা অন্য জেলার তুলনায় কম হওয়ায় মাথাপিছু বরাদ্দ বেশি। আর সবচেয়ে কম বরাদ্দ রয়েছে সিলেট জেলার জন্য। যা টাকার অঙ্কে ৬ হাজার টাকার নীচে।

৭ জেলার উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন বাজেটের তুলনা করলে দেখা যায় যে সব ক’টি জেলায় অনুন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দ উন্নয়ন বাজেট অপেক্ষা বেশি (ছক: ২)। উন্নয়ন বাজেটের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম জেলায় বরাদ্দ সবচেয়ে বেশি, যদিও মোট বাজেটে চট্টগ্রাম জেলায় মাথাপিছু বরাদ্দ অনেক কম। দ্বিতীয় স্থানে আছে খুলনা জেলা। আর রাজশাহী জেলায় বরাদ্দ সবচেয়ে কম (ছক ২)।
আর অনুন্নয়ন বাজেটের ক্ষেত্রেও চট্টগ্রামের বরাদ্দ সবচেয়ে বেশি। আর অন্য ৬টি জেলায় অনুন্নয়ন খাতে বরাদ্দ প্রায় সমান।

উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দের মধ্য দিয়ে সাধারন নাগরিক সরাসরি বাজেটের সুবিধা পায়। জেলাভিত্তিক বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে খুলনা জেলায় উন্নয়ন খাতে মাথাপিছু বরাদ্দ সবচেয়ে বেশি খুলনা জেলায় আর সবচেয়ে কম রাজশাহী জেলায়।

সেক্টরভিত্তিক বরাদ্দ
আমরা আমাদের আলোচনায় তিনটি সেক্টরকে বিবেচনায় নিয়েছি। এই তিনটি সেক্টর হলো:

  • স্বাস্থ্য
  • শিক্ষা
  • কৃষি

এই ৭টি জেলার মধ্যে ৩টি খাতে মাথাপিছু বরাদ্দের বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, কৃষি ও শিক্ষা বাজেটের তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ অনেক কম।

শিক্ষা খাতে রাজশাহী জেলায় মাথাপিছু বরাদ্দ সবচেয়ে বেশি আর সিলেট জেলায় বরাদ্দ সবচেয়ে কম।

স্বাস্থ্য খাতে বরিশাল জেলায় মাথাপিছু বরাদ্দ সবচেয়ে বেশি এবং চট্টগ্রামে বরাদ্দ সবচেয়ে কম।

কৃষি খাতে রাজশাহী জেলার মাথাপিছু বরাদ্দ সবচেয়ে বেশি আর খুলনা জেলায় সবচেয়ে কম।

উল্লেখ্য, এই বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে বিশেষ করে ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা ও কৃষক সংখ্যার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-এর জেলা পরিসংখ্যান ২০১১-কে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে।
জন-অংশগ্রহণহীন জেলা বাজেট
প্রকৃতপক্ষে এটি জেলা বাজেট নয়। বাজেট হতে হলে, আয়-ব্যয়ের চিত্র থাকতে হবে। এখানে সে চিত্র নেই। জেলাগুলি থেকে সরকার কী পরিমান অর্থ রাজন্ব আকারে তুলছে তার কোন হিসাব এখানে দেয়া হয়নি। সরকার নিজেও অবশ্য বলছে, এটা জেলা বাজেট নয়, যে কারণে এর নাম দেয়া হয়েছে ‘জেলাভিত্তিক বাজেট’, যার অর্থ হলো এই জেলাগুলিতে কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেটের কতো অংশ কোন কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে তার একটি তথ্যচিত্র দেখানো হয়েছে। এই বাজেট প্রণয়নের সাথে সাধারণ জনগণ কিংবা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কোন সম্পর্ক ছিল না। জেলার প্রয়োজন ও চাহিদাগুলি নিরূপনের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সাথে কোন আলাপ-আলোচনা করা হয়নি। গতানুগতিকভাবে যে কেন্দ্রীয় বাজেট তৈরি করা হয়, জেলা বাজেটও তার ধারাবাহিকতা মাত্র।

আমরা কেমন জেলা বাজেট চাই

  • জেলা বাজেট প্রণয়নে সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে
  • স্থানীয় চাহিদা নিরূপনের জেলা পর্যায়ে যতোগুলি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান রয়েছে সবাইকে যুক্ত করতে হবে
  • কর আহরণ প্রক্রিয়ারও বিকেন্দ্রীরকরণ করতে হবে, যাতে বুঝা যায় কোন জেলা থেকে কতো আয় হচ্ছে

গবেষণা:
গবেষণা টাস্কফোর্স, গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন
টাস্কফোর্স সদস্য ও সম্পাদক: মনোয়ার মস্তোফা, মোহাম্মদ শহিদ উল্লাহ, মোসফিকুর রহমান, এ. আর. আমান
সিরিজ কন্ট্রিবিউটর: মোসফিকুর রহমান